ঢাকার কা’ফরুল থানার ৪, ১৪ ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ড, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকা এবং মিরপুর (Mirpur) থানার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের একাংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা–১৫ সংসদীয় আসনটি বরাবরই জাতীয় রাজনীতির দিক থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আসন্ন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২১ জানুয়ারি থেকে এই আসনে শুরু হওয়া নির্বাচনী প্রচারণার মাত্রা এবং উত্তাপ সেই গুরুত্বের ইঙ্গিতই দিচ্ছে। এখানে ভোটযুদ্ধের বাইরেও শুরু হয়েছে প্রভাব, কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের সরাসরি লড়াই।
মাঠে রয়েছেন আটজন প্রার্থী, তবে মূল প্রতিযোগিতা জমেছে দুটি রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP)–এর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার এককভাবে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (Jamaat-e-Islami)। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান সরাসরি এই আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ঢাকা–১৫।
বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন সাবেক যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং রাজপথে দীর্ঘদিনের সক্রিয়তার কারণে নেতাকর্মীদের কাছে তিনি একজন পরীক্ষিত নেতা। একাধিকবার হ’\মলার শিকার ও কারাবরণ করেছেন তিনি, যা এই আসনে তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে, জামায়াতের কাছে এটা তাদের প্রেস্টিজের লড়াই। আজ পর্যন্ত কোনো নির্বাচনেই জয় না পাওয়া তাদের আমিরের জন্য অনেকটা বাঁচা মরার লড়াই। আর তাই জামায়াতের পক্ষ থেকেও তাদের আমির ডা. শফিকুর রহমানের পক্ষে সংগঠনের সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। নারী–পুরুষ নির্বিশেষে দলের কর্মীরা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পাড়া-মহল্লায় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। লক্ষ্য একটাই—বিএনপির ঐতিহ্যবাহী ঘাঁটিতে ভাঙন ধরানো।
তবে জামায়াতের প্রচারণা ঘিরে উঠেছে বিতর্ক। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভোটারদের এনআইডি নম্বর ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করা হচ্ছে। এমনকি ভোটের বিনিময়ে অর্থ প্রদানের প্রস্তাবও আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়টি ঘিরে নির্বাচনপূর্ব উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন অভিযোগ করেছেন, জামায়াত তাদের প্রচারণায় নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘন করছে। এক পর্যায়ে তিনি দাবি করেন, একটি রাজনৈতিক দল ভোটারদের বিকাশ নম্বর নিচ্ছে, যা নির্বাচনী অনিয়মের স্পষ্ট প্রমাণ। এই নিয়ে তাদের দলের পক্ষ থেকেও নির্বাচন কমিশনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও জানানো হয়। তবে জামায়াতের স্থানীয় নেতারা এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
বিএনপির অভ্যন্তরে মনোনয়নপ্রক্রিয়া ঘিরেও শুরুতে কিছুটা উত্তাপ থাকলেও তা দ্রুতই দমন হয়। যুবদলের সাবেক সভাপতি মামুন হাসান ছিলেন সম্ভাব্য প্রার্থীদের একজন, যিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে প্রায় ৩০০ মামলার আসামি ও বহুবার কারাবরণ করেছেন। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি নিজেকে সরিয়ে নেন এবং দল ঐক্যবদ্ধভাবে মিল্টনকে নিয়েই নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে। এই ঐক্যকে বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি বলেই মনে করছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।
তবে জামায়াতের পক্ষ থেকেও সমান তীব্রতায় প্রচারণা চলছে। তারা প্রতিদিন এলাকার ঘরে ঘরে যাচ্ছেন। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমিরের জয় নিশ্চিত বলেই দাবি করা হচ্ছে দলটির পক্ষ থেকে।
এই আসনে অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির আহাম্মদ সাজেদুল হক, জনতার দলের খান শোয়েব আমান উল্লাহ, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মোবারক হোসেন, বাংলাদেশ জাসদের মো. আশফাকুর রহমান, জাতীয় পার্টির মো. সামসুল হক এবং আমজনতার দলের মো. নিলাভ পারভেজ। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ উদ্যোগে প্রচারণা চালালেও বিএনপি ও জামায়াতের প্রচারের তোড়ে তাদের কার্যক্রম কিছুটা আড়ালে চলে গেছে।
ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঢাকা–১৫–তে যানজট, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা, বিশেষ করে নারী ও প্রবীণদের সুরক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সেবা গ্রহণে সহজলভ্যতা—এসবই ভোটারদের প্রধান চাহিদা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডা. শফিকুর রহমানের এই আসনে জয় শুধু জামায়াতের জন্য নির্বাচনী সাফল্য নয়, এটি দলের অস্তিত্ব ও মর্যাদার প্রশ্ন। অন্যদিকে বিএনপির জন্য এটি ঐতিহাসিক ঘাঁটি ধরে রাখার লড়াই। ফলে নির্বাচনী আলোচনায় ঢাকা–১৫ এখন টক অব দা কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে।


