গোমতীর পাড়ের একক উপজেলা দেবিদ্বার (Debidwar) নিয়ে গঠিত কুমিল্লা-৪ আসনে ভোটের মাঠে চরম উত্তেজনা। বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সির মনোনয়ন বাতিলের পর বদলে গেছে নির্বাচনের সমীকরণ। এখন মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ এবং বিএনপি সমর্থিত গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিন।
বিএনপি’র দুর্গখ্যাত এই আসনে আগে একতরফা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও ডামি প্রার্থীরা জয় পেলেও বিগত ৪টি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় আসে বিএনপি’র ঘরে। এর পেছনে মূল অবদান ছিলেন তিনবারের সাবেক এমপি মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি (Manjurul Ahsan Munshi)। এবারের ভোটেও তাকে মনোনয়ন দেয় বিএনপি, কিন্তু ঋণখেলাপির অভিযোগে হাইকোর্ট, নির্বাচন কমিশন এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পর্যন্ত মামলা গড়ায়। সবশেষে আপিল বিভাগ তার প্রার্থিতা বাতিল করে দিলে তিনি নির্বাচনের বাইরে চলে যান।
এরপর রাতারাতি পাল্টে যায় ভোটের গতিপথ। বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের জোটসঙ্গী গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিনকে সমর্থন দেয়। দলের কেন্দ্র থেকে মৌখিক নির্দেশনার পর দেবিদ্বারের ১৬টি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে বিএনপি’র নেতাকর্মীরা ট্রাক প্রতীকের পক্ষে নেমে পড়েন। মাঠ পর্যায়ে শুরু হয় গণজোয়ার। যে ট্রাক প্রতীক ৫ দিন আগেও ছিল আলোচনার বাইরে, এখন তা শাপলা কলির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি কর্মীরা এখন একযোগে জসিম উদ্দিনের জন্য প্রচারণায় ব্যস্ত। দেবিদ্বার ডাকবাংলো থেকে শুরু করে গুনাইঘর, সুলতানপুর, কাশিনগর, রাজামেহারসহ বিভিন্ন এলাকায় শোডাউন আর মিছিল-মিটিংয়ে জমজমাট পরিস্থিতি। অনেকে বলছেন, এটি যেন মুন্সির লড়াই নয়, বরং মুন্সির আদর্শ রক্ষার নতুন মঞ্চ।
দেবিদ্বার পৌরসভার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বললেন, “মুন্সির প্রার্থিতা বাতিলের পর দলীয় বিভক্তি দূর হয়ে গেছে। সবাই এখন একাট্টা হয়ে ট্রাকের পক্ষে কাজ করছে।” একই কথা বলেন গুনাইঘর ইউনিয়নের সামাদ ফকির, যিনি জানান, “৫ দিন আগেও জসিমের আশপাশে হাতেগোনা মানুষ থাকতো, এখন শত শত লোক।”
এদিকে, হাসনাত আবদুল্লাহও থেমে নেই। জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে তার অবস্থান শক্ত হলেও, বিএনপি’র বিপুল সমর্থন পাওয়া ট্রাক প্রতীকের বিরুদ্ধে তার লড়াই দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। ভোটারদের মধ্যে বিভাজন স্পষ্ট—একদিকে শাপলা কলি, অন্যদিকে ট্রাক।
স্থানীয় ভোটার রফিকুল ইসলাম জানান, “গতকাল ট্রাকের শোডাউন দেখে অবাক হয়েছি। পরে জানলাম, এটা মূলত বিএনপি’র পূর্ণ সমর্থনপুষ্ট প্রচারণা।”
বিএনপি’র উত্তর জেলা সদস্য সচিব এএফএম তারেক মুন্সি বলেন, “দল থেকে ট্রাকের পক্ষে কাজ করতে বলা হয়েছে, আমি নিজে মাঠে নামছি।” সাবেক ছাত্রনেতা এমএ আউয়াল খানসহ ছাত্রদল, যুবদল, শ্রমিক দল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতারাও মাঠে নেমেছেন।
গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জসিম উদ্দিন বলেন, “বিএনপি’র নেতাকর্মীদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। তারা বলছে, বিএনপি যাকে সমর্থন দেবে, তাকেই ভোট দেবে।”
সাবেক এমপি মুন্সিও বলেন, “দল থেকে আমাকে ট্রাকের পক্ষে কাজ করতে বলেছেন। আমি জসিম উদ্দিনকে ডেকেছি এবং তাকে সমর্থন দিয়েছি। আমার নেতাকর্মীরা ইতিমধ্যে তার পক্ষে নেমে পড়েছে। আমার সঙ্গে যে ষড়যন্ত্র হয়েছে, ১২ই ফেব্রুয়ারি ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণ তার জবাব দিয়ে দিবেন।”
৪ লাখ ১০ হাজার ৫৫৯ ভোটারবিশিষ্ট কুমিল্লা-৪ আসনে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৫ হাজার ২৩৭ এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৯৫ হাজার ৩১৯। এই বিপুল ভোটব্যাংক এখন দুই ভাগে বিভক্ত—শাপলা কলি বনাম ট্রাক। কে জিতবে, তা জানা যাবে ১২ ফেব্রুয়ারি। তবে একথা বলা যায়—দেবিদ্বারে ভোটের মাঠে যুদ্ধ চলছে সমানে সমান।



