রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পেট্রল পাম্পগুলোতে হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে জ্বালানি তেলের চাহিদা। এর ফলে বেশিরভাগ পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাচ্ছেন না অনেক যানবাহন চালক। খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে বহু মানুষকে, আর পাম্পগুলোর সামনে দেখা যাচ্ছে উপচে পড়া ভিড়।
শনিবার (৭ মার্চ) সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি চোখে পড়ে। সরেজমিনে দেখা যায়, বহু চালক দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরও সরকারের নির্ধারিত নিয়মে তেল সংগ্রহ করতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট কোটা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় পাম্প থেকে ফিরে যেতে হচ্ছে যানবাহনগুলোকে। তেল না পেয়ে অনেক জায়গায় গ্রাহক ও পাম্পকর্মীদের মধ্যে বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে।
এ পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা সরকারের কাছে পেট্রল পাম্পগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, কোথাও কোথাও তেল থাকা সত্ত্বেও বিক্রি বন্ধ রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে পাম্প মালিকদের দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, ডিপো থেকে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ হওয়ার কথা, তা ঠিকমতো আসছে না। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় হঠাৎ বাড়তি চাহিদার কারণে এই চাপ তৈরি হয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
শুধু রাজধানীই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। বিভিন্ন পেট্রল পাম্প ও ডিপোগুলোতে আজও ক্রেতাদের ভিড় অব্যাহত রয়েছে। যানভিত্তিক নির্ধারিত কোটার ভিত্তিতেই তেল সরবরাহ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সকাল থেকেই অধিকাংশ পাম্পে দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা যায়। অনেক ক্রেতার ধারণা, ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারেন—এই আশঙ্কা থেকেই তারা আগেভাগে প্রয়োজনমতো পেট্রল ও অকটেন সংগ্রহ করার চেষ্টা করছেন। তবে কোথাও কোথাও তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে পাম্প বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অতিরিক্ত চাহিদার চাপেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে তারা এখনো বড় কোনো সংকট তৈরি হয়নি বলেই দাবি করছেন।
এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ (Chapainawabganj) জেলার শিবগঞ্জ (Shibganj) উপজেলার পুকুরিয়া পেট্রোল পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, তেল নেওয়ার জন্য চালকদের জটলা তৈরি হয়েছে। অনেকেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, কিছু পাম্পে তেল মজুত থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে, যাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্থানীয় পাম্প মালিকরা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের পেট্রল পাম্প মালিক গণমাধ্যমকে জানান, জেলায় জ্বালানি তেলের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। ডিপো থেকে সরবরাহ স্বাভাবিকভাবেই চলছে। তবে কিছু পাম্প মালিক যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তেল বিক্রি বন্ধ রাখেন, সেটি অনৈতিক বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে চালকদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী তেল নেওয়ার পরামর্শও দেন।
কিছু চালকের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনার সুযোগ নিচ্ছেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। তাদের দাবি, সম্ভাব্য পরিস্থিতির অজুহাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে।
তবে ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। গত দুই দিন ধরেই সরবরাহ কমে গেছে বলে তারা জানিয়েছেন।
বগুড়া (Bogura) অঞ্চলের কয়েকটি তেলের পাম্প ঘুরে বগুড়া ফিলিং স্টেশনে আসা এক ব্যক্তি গণমাধ্যমকে বলেন, প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তেল নেওয়ার জন্য ঘুরছেন তিনি। মাঝিরা টিএমএসএস পাম্পে প্রচুর ভিড় থাকায় সেখানে সুযোগ পাননি। তুলনামূলক কম ভিড় দেখে বগুড়া ফিলিং স্টেশনে এসেছেন। এখান থেকেও তেল না পেলে মোটরসাইকেল চালানো কঠিন হয়ে পড়বে বলে জানান তিনি।
কমল নামে এক মোটরসাইকেল চালক অভিযোগ করে বলেন, এভাবে তেল সরবরাহ বন্ধ রেখে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইরান ও আমেরিকার সম্ভাব্য সংঘাতের সুযোগ নিয়ে এখানে সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারিভাবে এখনো জ্বালানির দাম বাড়ানোর কোনো ঘোষণা না থাকলেও সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন। তবে ভোক্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, গুজবের কারণে অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল সংগ্রহ করতে চাইছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।


