সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া (Khaleda Zia)-কে গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগের সঙ্গে স্মরণ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party)-এর মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (Mirza Fakhrul Islam Alamgir) বলেছেন, ‘দেশনেত্রীর স্নেহের ছায়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
সম্প্রতি সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (Bangladesh Sangbad Sangstha)-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এই অনুভূতির কথা তুলে ধরেন। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার স্মৃতি মনে পড়লে কেমন লাগে— এমন প্রশ্নে তিনি জানান, ‘আমি তাকে প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। তিনি বছরের পর বছর মমতা আর স্নেহে আমাকে আগলে রেখেছেন— এটিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।’
নিজের রাজনৈতিক পথচলার শুরুর দিকের কথা স্মরণ করে ফখরুল বলেন, ‘আমি খুব সাধারণ একজন কর্মী ছিলাম। দেশনেত্রী নিজেই আমাকে তুলে এনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছেন। তার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে সবসময় মনে হয়েছে— তিনি আমাকে বিশেষভাবে আশীর্বাদ করেছেন। তার দিকনির্দেশনায় আমি ভুল পথে যাইনি। কখনো ভুল করলেও তিনি তা শুধরে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন।’
দলের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, ‘আমি সবসময় চেষ্টা করেছি ম্যাডামের চিন্তা-ভাবনা বাস্তবায়ন করতে এবং তিনি যেভাবে দলকে এগিয়ে নিতে চেয়েছেন, সেই অনুযায়ী কাজ করতে।’
সাক্ষাৎকারে এক পর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, ‘আমার দুর্ভাগ্য— ম্যাডামের জীবনের শেষ সময়ে তাকে হাসপাতালে প্রায় প্রতিদিনই দেখেছি। আবার এটাও সৌভাগ্য— তার শেষ সময়ের পাশে থাকতে পেরেছি। কিন্তু সেই দিনগুলো আমাকে ভীষণ কষ্ট দিত। বুকের ভেতরটা কুঁকড়ে উঠতো। তবুও আশা ছিল— তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন।’
খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তার সঙ্গে কারো তুলনা হয় না। তার জানাজায় মানুষের যে ঢল নেমেছিল, তা অবিশ্বাস্য। মনে হয়েছিল যেন এক অদৃশ্য টানে সবাই এসে জড়ো হয়েছে। এত মানুষের মাঝেও ছিল এক অদ্ভুত নীরবতা— পিনপতন নীরবতা। কোনো বিশৃঙ্খলা ছিল না। এটা আমার কাছে এক ধরনের ঐশ্বরিক ঘটনা মনে হয়েছে।’
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর বিএনপির রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘এই অনুভূতি এক কথায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রায় ১৮ বছরের সংগ্রাম, অসংখ্য ত্যাগ, সহকর্মীদের হারানো— সব মিলিয়ে এটি আনন্দ ও বেদনার মিশ্র অনুভূতি।’
তিনি উল্লেখ করেন, ‘এই সময়ে বহু নেতাকর্মী প্রাণ দিয়েছেন, লক্ষাধিক মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমসহ অনেক নেতার গুম হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আমাদের নেত্রীকে অন্যায়ভাবে কারাবন্দি রাখা হয়েছে, পরে অসুস্থ অবস্থায় গৃহবন্দি করা হয়। আমাদের নেতা তারেক রহমান (Tarique Rahman)-কেও দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকতে হয়েছে— এসব সহজ ছিল না।’
বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই দীর্ঘ সংগ্রামের পর জনগণের সমর্থনে আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছি। কিন্তু আমাদের নেত্রী আজ আমাদের মাঝে নেই— এটিও বড় কষ্টের জায়গা। তবে তারেক রহমান দেশে ফিরে এসেছেন— এটি আশার দিক।’
আগামী দিনের লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র রক্ষা করা এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। দেশনেত্রী মানুষের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তার মর্যাদা রক্ষা করা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করাই আমাদের লক্ষ্য।’
সরকার পরিচালনায় তারেক রহমানের ভূমিকা প্রসঙ্গে ফখরুল বলেন, ‘তিনি একজন কাজপাগল মানুষ। অতীতে যেমন দেখেছি, এখনো একইভাবে নিরলস কাজ করছেন। তৃণমূল থেকে সংগঠন গড়ে তোলার যে উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন, তা আজও অব্যাহত আছে। নির্বাসনে থেকেও তিনি সার্বক্ষণিকভাবে দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন অনেকেই বলছেন— বহু বছর পর দেশ একজন ভিন্নধর্মী প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে, যিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। আমার বিশ্বাস, তিনি তার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মা খালেদা জিয়ার মতোই মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেবেন।’
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই দুর্নীতি বন্ধে কাজ করছি। ইতোমধ্যে ওয়াসার এমডিকে সরানো হয়েছে, একাধিক প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ধীরে ধীরে আমরা শক্ত অবস্থানে পৌঁছাবো এবং যেকোনো দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবো।’


