খেলোয়াড়দের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর, ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার

খেলোয়াড়দের প্রতি স্পষ্ট বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)—পেশাদার ক্রীড়াজীবনে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, খেলোয়াড়দের পরিচয় হবে তাদের ক্রীড়া নৈপুণ্যে, কোনো দলীয় পরিচয়ে নয়। দেশের প্রতিনিধিত্ব করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করাই হওয়া উচিত তাদের মূল লক্ষ্য।

রবিবার (৩০ মার্চ) সকাল সাড়ে ১০টায় তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে ক্রীড়া কার্ড ও ভাতা প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, দেশপ্রেম, দৃঢ় মনোবল এবং দলগত ঐক্য থাকলে খেলোয়াড়দের অগ্রযাত্রা থামানো সম্ভব নয়।

প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বর্তমান বিশ্বে ক্রীড়া আর শুধুই বিনোদন বা শরীরচর্চার বিষয় নয়—এটি এখন একটি প্রতিষ্ঠিত পেশা। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশকেও এগিয়ে নিতে সরকার কাজ শুরু করেছে। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP) ক্ষমতায় এলে ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে—আজ সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো।

খেলাধুলায় পরাজয়কে তিনি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। তারেক রহমান বলেন, পরাজয় মানেই হার নয়, বরং তা জয়েরই একটি অংশ। তিনি আলবার্ট আইনস্টাইনের উদ্ধৃতি টেনে বলেন, যে ব্যক্তি কখনো হারেনি, সে আসলে কখনো কিছু অর্জনের চেষ্টাই করেনি।

সরকার খেলোয়াড়দের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেতন কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান তিনি। যাতে একজন খেলোয়াড় তার পছন্দের খেলাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে নিশ্চিন্তে এগিয়ে যেতে পারে এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে আর্থিক অনিশ্চয়তায় না ভোগে—সে লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ।

দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ক্রীড়াবিদদের জন্য বেতন কাঠামো চালু এবং ক্রীড়া ভাতা প্রদান শুরু হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে তিনি সরকারের অন্যান্য সামাজিক উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন—যেমন ফ্যামিলি কার্ড, ইমাম-খতিব ও অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের জন্য ভাতা, এবং খাল খনন কর্মসূচি।

তিনি জানান, আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হবে ‘ফার্মার্স কার্ড’ বা কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রম। এই ধারাবাহিকতায় আজ চালু হলো ‘ক্রীড়া কার্ড’, যা দেশের ক্রীড়াবিদদের জন্য একটি নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও যারা ক্রীড়াক্ষেত্রে অবদান রাখতে সক্ষম, তারাও এই সুবিধার আওতায় আসবেন। ‘সবার জন্য ক্রীড়া’—এই লক্ষ্য সামনে রেখে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ক্রিকেট ও ফুটবল জনপ্রিয় হলেও তিনি অন্যান্য খেলাধুলার সম্ভাবনার দিকেও দৃষ্টি দেন। আরচারি, বক্সিং, জিমন্যাস্টিকস, সাঁতার, অ্যাথলেটিক্স, কারাতে, কাবাডি, ব্যাডমিন্টনসহ বহু খেলা যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য বয়ে আনতে পারে বলে উল্লেখ করেন। সম্প্রতি সাফ নারী ফুটসালে বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ঘটনাও তিনি স্মরণ করেন।

শিক্ষা ব্যবস্থায় খেলাধুলাকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। ৪র্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার চিন্তাভাবনা চলছে, যাতে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি ক্রীড়ায় আগ্রহী হয়ে ওঠে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ টেলিভিশন (BTV)-এর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’র নতুন সংস্করণের কথাও তুলে ধরেন তিনি। শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া প্রতিভা খুঁজে বের করতে আগামী ৩০ এপ্রিল থেকে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ দেশব্যাপী শুরু হবে, যার যাত্রা শুরু হবে সিলেট থেকে।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর এক ক্লিকেই সোনালী ব্যাংক (Sonali Bank)-এর অনলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে ১২৯ জন ক্রীড়াবিদের মোবাইলে এক লাখ টাকা করে পৌঁছে যায়। একইসঙ্গে তাদের হাতে ক্রীড়া কার্ড তুলে দেওয়া হয় এবং আন্তর্জাতিক সাফল্য অর্জনকারী খেলোয়াড়দের সম্মাননা প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। উপস্থিত ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (Mirza Fakhrul Islam Alamgir), ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, আহমেদ আযম খান, মিজানুর রহমান মিনুসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী খেলোয়াড়দের সঙ্গে শাপলা হলের বাইরে ফটোসেশনে অংশ নেন—যেখানে নতুন এই উদ্যোগের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *