জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কারের দাবিকে ঘিরে দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করল বিরোধী দলীয় জোট। আর এই ঘটনার পরই আন্দোলনের পথে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (Bangladesh Jamaat-e-Islami)-এর আমীর ডা. শফিকুর রহমান (Shafiqur Rahman)।
বুধবার (১ এপ্রিল) সন্ধ্যায় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “আমরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছি, সংসদকে ত্যাগ করিনি। আমরা সংসদেরই অংশ। কিন্তু এখন আন্দোলন ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।”
তিনি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ (Salahuddin Ahmed) একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যেখানে জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়। সেই সঙ্গে সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের কথাও ওঠে। তবে বিরোধী দল স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, জনগণের কাছে গণভোটে সংবিধান সংশোধনের নয়, বরং সংস্কারের জন্যই রায় চাওয়া হয়েছিল।
শফিকুর রহমান বলেন, “জনগণ যে রায় দিয়েছে, আমরা তার পক্ষেই দাঁড়িয়েছি। সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত কোনো কমিটি এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। যদি সত্যিই সদিচ্ছা থাকে, তাহলে প্রস্তাবটি সংস্কারভিত্তিক হতে হবে।”
তিনি আরও জানান, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে শর্ত দেওয়া হয়েছিল—কমিটিতে সরকার ও বিরোধী দলের সমানসংখ্যক সদস্য থাকতে হবে। কিন্তু এই প্রস্তাবে আপত্তি জানানো হলে আলোচনা কার্যত থেমে যায়।
পরবর্তী সময়ে আইনমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে জানান, তিনি বিরোধী দলের প্রস্তাবে আংশিকভাবে সম্মত হয়েছেন এবং সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত কমিটির প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে জামায়াত আমীর বলেন, “আমি স্পষ্টভাবে বলেছিলাম, এটি হতে হবে সংবিধান সংস্কার। কিন্তু আমাকে ভুলভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে।”
তিনি স্পিকারের কাছে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ চাইলেও নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। পরে স্পিকার তাকে পরদিন কথা বলার সুযোগ দেন।
পরদিন সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান এবং জানতে চান আলোচনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হয়েছে। জবাবে স্পিকার অতীতের মূলতবি প্রস্তাবগুলোর উদাহরণ টেনে বলেন, খুব কম সংখ্যক প্রস্তাবই গৃহীত হয়েছে এবং বর্তমান প্রস্তাবটি গৃহীত হয়নি—আলোচনার মধ্যেই শেষ হয়েছে।
এই অবস্থায় গভীর হতাশা প্রকাশ করে শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা সংকটের সমাধান চাইছিলাম, সংকট তৈরি করতে আসিনি। কিন্তু জাতির দেওয়া ম্যান্ডেটকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে, যা এক ধরনের অপমান।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণভোটের রায়কে অমান্য করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয় এবং এই অবস্থানের প্রতিবাদেই তারা ওয়াকআউট করেছেন।
এছাড়া তিনি অভিযোগ করেন, জনগণের অভিপ্রায়কে চাপা দিতে পরিকল্পিতভাবে একটি নোটিশ আনা হয়েছে, যার প্রতিবাদেও তারা সংসদ ত্যাগ করেন।
জামায়াত আমীর স্মরণ করিয়ে দেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে অনুষ্ঠিত তিনটি গণভোটেই জনগণের রায় অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম ঘটেছে—যেখানে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই গণভোট চেয়েছিল, অথচ পরে এসে সেটিকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সংবিধানের মূল ভিত্তি—জনগণের রায়কেই উপেক্ষা করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “সংসদের ভেতরেই যদি এই সংকটের সমাধান হতো, তাহলে জনগণ স্বস্তি পেত। কিন্তু তা হয়নি। এখন আমাদের সামনে একমাত্র পথ—জনগণের কাছে ফিরে যাওয়া।”
শেষে তিনি ঘোষণা দেন, জনগণকে সঙ্গে নিয়েই তারা গণভোটের দাবি বাস্তবায়নের কর্মসূচি গ্রহণ করবেন এবং অতীতের মতো এবারও জনগণের সমর্থন পাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।


