সদ্যবিদায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কমিশনারদের খোলা চিঠি: সংসদের তথ্যভ্রান্তি, আইনি দুর্বলতা ও ভবিষ্যৎ আইন নিয়ে প্রশ্ন

সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব, অধ্যাদেশগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের প্রকৃত আপত্তি চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যৎ আইনের গুণগত মান নির্ধারণে প্রস্তাবনা তুলে ধরে একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন সদ্যবিদায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (National Human Rights Commission)–এর পাঁচ কমিশনার।

বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, মো. নুর খান, ইলিরা দেওয়ান, অধ্যাপক মো. শরীফুর ইসলাম এবং ড. নাবিলা ইদ্রিস স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাস না হওয়ায় ভুক্তভোগীরা বারবার প্রশ্ন করছেন—“এখন আমাদের কী হবে?” এই দায়বদ্ধতা থেকেই তাঁদের এই উদ্যোগ।

চিঠিতে তাঁরা নিজেদের পরিচয় তুলে ধরে বলেন, তাঁরা প্রত্যেকে দীর্ঘদিন মানবাধিকার সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে ভুক্তভোগীদের বেদনা, আইন প্রয়োগকারীদের প্রতিকূলতা এবং বিচারব্যবস্থার জটিলতা সম্পর্কে তাঁদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, বরং দায়িত্ববোধ থেকেই তাঁরা এই বক্তব্য তুলে ধরেছেন।

চিঠিটি মূলত তিনটি অংশে বিভক্ত—সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব, সরকারের প্রকৃত আপত্তির বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ আইন প্রণয়নের মানদণ্ড নির্ধারণ।

সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব
অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে সংসদে যে যুক্তিগুলো দেওয়া হয়েছে, কমিশনাররা সেগুলোর একাধিক ক্ষেত্রে সংশোধন তুলে ধরেছেন।

প্রথমত, বলা হয়েছিল গু’\মের শাস্তি মাত্র ১০ বছর। কিন্তু বাস্তবে গু’\ম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ অনুযায়ী অপরাধের মাত্রা অনুসারে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃ’\ত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অন্যান্য মেয়াদের সাজা এবং জরিমানার বিধান রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, তদন্তের সময়সীমা ও জরিমানা আদায়ের কোনো পদ্ধতি নেই বলে দাবি করা হয়েছিল। অথচ সংশ্লিষ্ট আইনে তদন্তের নির্দিষ্ট সময়সীমা ও জরিমানা নির্ধারণের বিস্তারিত পদ্ধতি উল্লেখ আছে। এমনকি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট না দিলে শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে।

তৃতীয়ত, আইসিটি (ICT Act) আইনই যথেষ্ট এবং নতুন অধ্যাদেশ অপ্রয়োজনীয়—এই বক্তব্যেরও প্রতিবাদ জানানো হয়। কমিশনাররা বলেন, আইসিটি আইন কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার করতে পারে, বিচ্ছিন্ন গু’\মের মতো ফৌজদারি অপরাধ নয়। ফলে অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় ১১ এপ্রিলের পর কোনো নতুন গু’\ম ঘটলে তা আইনের দৃষ্টিতে শূন্যতায় পড়ে যাবে।

চতুর্থত, জুলাই অভ্যুত্থান সংক্রান্ত সুরক্ষা নিয়ে সংসদে যে বক্তব্য এসেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কোন মৃ’\ত্যু রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ আর কোনটি বিশৃঙ্খলার সুযোগে সংঘটিত হ’\ত্যা—তা নির্ধারণ করত মানবাধিকার কমিশন। কিন্তু পুনর্বহালকৃত আইনে সেই স্বাধীনতা নেই।

পঞ্চমত, কমিশন তদন্ত করে নিজেই মামলা করলে তা পক্ষপাতমূলক—এই যুক্তিও খণ্ডন করা হয়েছে। বলা হয়, তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে পুলিশের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া চালু রয়েছে।

ষষ্ঠত, ২০০৯ সালের আইন এবং নতুন অধ্যাদেশ সমান শক্তিশালী—এই দাবিকেও অগ্রাহ্য করা হয়। কারণ পুরনো আইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা নেই, যা নতুন অধ্যাদেশে ছিল।

সরকারের প্রকৃত আপত্তি কোথায়
চিঠিতে বলা হয়, সংসদীয় বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে সরকারের প্রকৃত আপত্তিগুলো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, যার মূল লক্ষ্য ছিল মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা সীমিত করা।

কমিশনকে মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা, নিরাপত্তা বাহিনীর তদন্তে পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে গু’\মের সংজ্ঞা সীমিত করার প্রস্তাব—এসবই কমিশনের কার্যকর ক্ষমতাকে খর্ব করে।

এছাড়া কমিশনার নিয়োগে বাছাই কমিটিতে সরকারি প্রভাব বাড়ানোর প্রস্তাবও উল্লেখ করা হয়, যা ভবিষ্যতে দলীয়করণের ঝুঁকি বাড়াবে।

ভবিষ্যৎ আইন নিয়ে সতর্ক বার্তা
চিঠির শেষাংশে কমিশনাররা বলেন, সরকারের অবস্থানের মধ্যেই একটি দ্বন্দ্ব রয়েছে। একদিকে শক্তিশালী আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে এমন আপত্তি যা মেনে নিলে আইন দুর্বল হয়ে পড়বে।

তাঁরা উল্লেখ করেন, নতুন অধ্যাদেশ প্রণয়নের আগে ৬০০-এর বেশি অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়েছিল। ফলে অধ্যাদেশ বাতিল না করেও সংশোধনের সুযোগ ছিল।

এছাড়া আইসিপিপিইডি (ICPPED) আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করায় রাষ্ট্র বাধ্য গু’\মকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে। ভবিষ্যতে নতুন আইন প্রণয়ন হলে সেটি শক্তিশালী হচ্ছে নাকি দুর্বল—সেদিকেই নজর রাখার আহ্বান জানান তাঁরা।

সবশেষে, অপেক্ষমাণ পরিবারগুলোর প্রশ্ন তুলে ধরে বলা হয়—“এখন আমাদের কী হবে?”—এই প্রশ্নের উত্তর কেবল আশ্বাসে নয়, কার্যকর ও শক্তিশালী আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই দিতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *