নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)। তারই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে দেশের ১০টি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে প্রি-পাইলটিং হিসেবে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি এক কৃষক সমাবেশে বক্তব্যও রাখবেন। এরপর দুপুর সোয়া ১২টায় পৌর উদ্যানে কৃষিমেলার উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। এর আগে সকাল ১০টায় টাঙ্গাইলে পৌঁছে সন্তোষে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী (Maulana Abdul Hamid Khan Bhashani)-এর মাজার জিয়ারত করবেন তিনি।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত কৃষক সমাজকে সরাসরি ক্ষমতায়নের লক্ষ্যেই পহেলা বৈশাখ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে এই কর্মসূচি। সরকার বলছে, কৃষিখাতকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করতেই ‘কৃষক কার্ড’ চালুর এই উদ্যোগ।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) বাংলাদেশ সচিবালয় (Bangladesh Secretariat)-এ কৃষি ও কৃষিজাত শিল্পে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন (Mahdi Amin) বলেন, নির্বাচনী বিজয়ের মাত্র দুই মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তার প্রতিশ্রুতিগুলো একে একে বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য কৃষকদের অধিকার সুরক্ষা এবং তাদের জীবনমান উন্নয়ন।
তিনি আরও জানান, প্রথম পর্যায়ে দেশের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলায় এই কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে প্রায় ৩০ লাখ কৃষককে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। উদ্বোধনের দিন টাঙ্গাইলে ১৫০০ জন কৃষকের হাতে ব্যক্তিগতভাবে কার্ড তুলে দেওয়া হবে।
প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে পঞ্চগড়, বগুড়া, ঝিনাইদহ, পিরোজপুর, কক্সবাজার, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ি, মৌলভিবাজার ও জামালপুর জেলার নির্দিষ্ট ব্লকে এই কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। তিন ধাপে—প্রাক-পাইলটিং, পাইলটিং এবং দেশব্যাপী বাস্তবায়নের মাধ্যমে সারা দেশের কৃষকদের এই কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ (Mohammad Aminur Rashid) জানিয়েছেন, এই কর্মসূচির আওতায় শুধু ফসল উৎপাদনকারী কৃষকই নন, মৎস্যচাষি, প্রাণিসম্পদ খামারি, দুগ্ধ উৎপাদক এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে লবণচাষিরাও অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। ভূমিহীন থেকে বড় কৃষক—সব শ্রেণিকেই এতে রাখা হয়েছে।
প্রাক-পাইলটিং বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এ পর্যায় শেষে আগস্টের মধ্যে আরও ১৫টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প চালু করা হবে। এরপর চার বছরের মধ্যে সারা দেশে এই কার্ড বিতরণ এবং একটি সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
এই কার্ড মূলত একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড, যা সোনালী ব্যাংক (Sonali Bank)-এর মাধ্যমে পরিচালিত হবে। সংশ্লিষ্ট কৃষকদের নামে ব্যাংক হিসাবও খোলা হয়েছে। ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, যার মধ্যে ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় কৃষক অন্তর্ভুক্ত।
ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য বিশেষ সুবিধা হিসেবে বছরে আড়াই হাজার টাকা নগদ সহায়তাও দেওয়া হবে। এই সুবিধা পাবেন ২০ হাজার ৬৭১ জন কৃষক।
‘কৃষক কার্ড’ধারীরা মোট ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন—ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কম দামে কৃষিযন্ত্র, সরকারি ভর্তুকি, মোবাইলে আবহাওয়া ও বাজার তথ্য, প্রশিক্ষণ, রোগবালাই প্রতিরোধ পরামর্শ, কৃষি বিমা এবং ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রির সুযোগ।
এই কার্ড ব্যবহার করে কৃষকেরা পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিনের মাধ্যমে ডিলারের কাছ থেকে সার, বীজ, মাছ ও প্রাণিখাদ্যসহ বিভিন্ন উপকরণ কিনতে পারবেন।
এর আগে গত ১০ মার্চ সরকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে, যার মাধ্যমে নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে মাসে ২,৫০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে ৩৭ হাজার ৫৬৭ পরিবার এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে চার কোটি পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া ক্রীড়াবিদদের জন্য ‘ক্রীড়া কার্ড’ এবং ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী প্রদান কর্মসূচিও চালু করেছে সরকার। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে সরাসরি সহায়তার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।


