নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় ও সেতু বিভাগের প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান রোববার জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলের সাম্প্রতিক আচরণ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুললেন। তাঁর ভাষায়, গত কয়েকদিনে বিরোধীদলীয় সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—আর সেই অস্থিরতার পেছনের কারণ খুঁজতে গিয়েই তিনি একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যায় পৌঁছেছেন।
তিনি বলেন, গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে সুবিধার মধ্যে বিরোধী নেতারা ছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আরাম আর নেই। আর সেই পরিবর্তনই নানা সমস্যার জন্ম দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রোববার বিকেল তিনটায় জাতীয় সংসদ অধিবেশন শুরু হয় স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমেদ-এর সভাপতিত্বে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেন।
আলোচনার একপর্যায়ে তিনি অতীতের ‘ওয়ান ইলেভেন’ সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সেই সরকারকে সেনা-সমর্থিত হিসেবে সবাই চিনত। এরপর তিনি গত ১৮ মাসের সরকারকে উল্লেখ করে দাবি করেন, সেটি বিরোধীদলীয় নেতৃত্বাধীন—বিশেষ করে জামায়াতে ইসলাম (Jamaat-e-Islami) এবং এনসিপি (NCP)-সমর্থিত বলে পরিচিত ছিল। এ বক্তব্যে সংসদে উপস্থিত বিরোধী সদস্যদের মধ্যে হইচই শুরু হয়।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, “গত ১৮ মাসে তারা যেভাবে চলাফেরা করেছেন, এখন সেই সুযোগ আর নেই। আগে ইচ্ছা হলেই প্রধান উপদেষ্টার বাসায় ঢুকে পড়া, এমনকি বেডরুম বা সচিবদের কক্ষে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে—এমন বক্তব্যও রয়েছে আন্দোলনের একজন নেতার।” তাঁর দাবি, এই ‘অবারিত প্রবেশাধিকার’ এখন আর না থাকায় বিরোধীদলের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
জুলাই আন্দোলনের শহীদের সংখ্যা নিয়েও সংসদে ভিন্নমত তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষ্যমতে, একই বিষয়ে বিভিন্ন সংসদ সদস্য ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা উল্লেখ করেছেন—কেউ বলেছেন ৮৪৪, কেউ এক হাজারের বেশি, আবার কেউ বলেছেন ১৪০০। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শুরুতে বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্যের ভিত্তিতে ১৪০০-এর বেশি শহীদের কথা বলেছিল এবং জাতিসংঘ (United Nations)-ও সে ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু পরে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় গেজেট আকারে ৮৪৪ জনের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বিরোধীদলীয় নেতার একটি বক্তব্য তুলে ধরেন। ১৪ এপ্রিল ২০২৬-এর এক অনুষ্ঠানে ওই নেতা দাবি করেছিলেন, ১৪০০ শহীদের মধ্যে ১২০০ পরিবারের সঙ্গে তিনি দেখা করেছেন। প্রতিমন্ত্রীর প্রশ্ন—সরকারি গেজেটে যেখানে ৮৪৪ জনের তালিকা, সেখানে ১৪০০ শহীদের মধ্যে ১২০০ পরিবারের কাছে যাওয়ার বিষয়টি কীভাবে সম্ভব?
রাজিব আহসান বলেন, “প্রকৃত সংখ্যা জানা জরুরি। কারণ এখনই যদি বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তাহলে ১০ বা ২০ বছর পর এই ইতিহাস কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা বলা কঠিন।” তিনি আরও যোগ করেন, মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে গত ৫৪ বছরে যেভাবে ‘ব্যবসা’ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নতুন করে তেমন কিছু হোক—তা সরকার চায় না।
বাকস্বাধীনতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার সমালোচনাকে স্বাগত জানায়। “ভুল হলে বলবেন, সমালোচনা করবেন, কার্টুন করবেন—তবে তা যেন নিয়মের মধ্যে থাকে,”—এমনটাই তাঁর বক্তব্য।
প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য করে কটূক্তির প্রসঙ্গ টেনে তিনি এটিকে দুঃখজনক বলে আখ্যা দেন। বিরোধী দলের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আপনারা ভালো কথা বলবেন, আমরা শুনতে চাই। কিন্তু যারা কুৎসা রটনা করেছে, তাদেরই যদি পুরস্কৃত করা হয়, তাহলে সেটি কী বার্তা দেয়?” তিনি প্রশ্ন তোলেন, অশালীন মন্তব্যকারী ব্যক্তির পরিবারের সদস্যকে সংসদ সদস্য করা হলে তার মাধ্যমে কী প্রমাণ করতে চাওয়া হচ্ছে।


