অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সৃষ্ট অস্থিরতার পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারত পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালুর দিকে এগোচ্ছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সব ক্যাটাগরিতে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ভিসা সেবা চালু করেছে। অন্যদিকে ভারতও আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৈরি হওয়া টানাপোড়েন কাটিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত এখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। এর অংশ হিসেবেই দুই দেশ ভিসা কার্যক্রম পুনরায় পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর পথে এগোচ্ছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সব ধরনের ক্যাটাগরিতে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ভিসা কার্যক্রম চালু করেছে, যা কূটনৈতিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে ভারতও ধীরে ধীরে একই পথে হাঁটছে। দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে দিল্লির।
গত মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা খলিলুর রহমান ভারত সফরে গেলে ভিসা স্বাভাবিকীকরণের বিষয়টি ঢাকার পক্ষ থেকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। বর্তমানে ভারতের সব ভিসা সেন্টার—নয়াদিল্লির হাইকমিশনসহ কলকাতা, আগরতলা, মুম্বাই ও চেন্নাইয়ের কনস্যুলার বিভাগ—পূর্ণ কার্যক্রমে ফিরে এসেছে। ঢাকা এখন একই ধরনের দ্রুত পদক্ষেপ আশা করছে দিল্লির কাছ থেকে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ বলেন, “গত বছরের ডিসেম্বরে কয়েকটি ভিসা কেন্দ্র সাময়িকভাবে স্থগিত করতে হয়েছিল। পরে ফেব্রুয়ারিতে সেগুলো পুনরায় চালু করা হয়।”
ফেব্রুয়ারিতে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার নেতৃত্বাধীন ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ঢাকা সফর করেন। ওই সময় দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও সক্রিয় হয় এবং উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন সমন্বয়ের চেষ্টা শুরু হয় এবং দুই দেশই ধীরে ধীরে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে এগোচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভিসা ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক, জ্বালানি সহযোগিতা এবং অন্যান্য খাতে নতুন গতি আসবে। পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সম্প্রতি পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশে ডিজেল পাঠিয়েছে ভারত। বিষয়টি দুই দেশের সহযোগিতার একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নয়াদিল্লির সরকারি সূত্র জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে গত বছর বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা কার্যক্রমে বড় প্রভাব পড়লেও এটি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিশেষ করে চিকিৎসা ও পারিবারিক জরুরি প্রয়োজনে ভিসা আবেদন বিবেচনা করা হয়েছে।
বর্তমানে ধাপে ধাপে ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালুর কাজ চলছে। বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতীয় ভিসা সেবা এখন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের আগের সক্ষমতার মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশে পরিচালিত হচ্ছে। চিকিৎসা ও পারিবারিক ভিসাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
শিগগিরই নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দায়িত্ব গ্রহণের পর ভিসা কার্যক্রম আরও দ্রুত স্বাভাবিক হতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে কার্যক্রম পুনরায় চালুর পর গত দুই মাসে ১৩ হাজারের বেশি ভারতীয় নাগরিককে ভিসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ব্যবসা, পর্যটন, চিকিৎসা এবং পারিবারিক সফরের ভিসা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, ভারতীয় নাগরিকরা সাধারণত নয়াদিল্লি, মুম্বাই ও চেন্নাইয়ে ব্যবসা ও পর্যটন ভিসার জন্য আবেদন করেন। অন্যদিকে কলকাতা ও আগরতলায় পারিবারিক কারণে বেশি আবেদন জমা পড়ে।
ভারতের বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে বাংলাদেশিদের অংশ ২০ শতাংশেরও বেশি। চিকিৎসা, ব্যবসা এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ—এগুলোই প্রধান উদ্দেশ্য। পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের নাগরিকদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় ২১ লাখ ২০ হাজার বাংলাদেশি ভারতে সফর করেছিলেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা কিছুটা কমে ১৭ লাখ ৫০ হাজারে নেমে আসে। তবে ২০২৫ সালে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ভিসা বিধিনিষেধের কারণে তা নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ৪ লাখ ৭০ হাজারে দাঁড়ায়। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি চট্টগ্রাম ও সিলেটে ভারতীয় মিশনের সামনে বিক্ষোভের পর ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্টও সীমিত করা হয়েছিল।


