গঠনতন্ত্রের বিধানেই তারেক রহমান বর্তমানে বিএনপির চেয়ারম্যান

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ইন্তে’\কাল করায় দলটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পদটি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে শূন্য হয়ে পড়েছে। বেগম জিয়া কারাবন্দি থাকা অবস্থায় এবং দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার সময় থেকেই দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে বিএনপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনে তারেক রহমানের ক্ষেত্রে কোনো আইনগত বা সাংবিধানিক বাধা না থাকলেও গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপিপ্রধানের নি’\ধনের পর এখনো পর্যন্ত তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ হিসেবেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। দলের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি ও বিবৃতিতেও তাকে এখনও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনি আচরণবিধিমালার ৭ ধারার ‘চ’ উপধারায় বলা হয়েছে, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী কেবল তার বর্তমান দলীয় প্রধানের ছবি ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুনে ব্যবহার করতে পারবেন। পোস্টার ছাপানোর সুযোগও নেই। কিন্তু কাগজ-কলমে এখনো বিএনপির দলীয় প্রধান হিসেবে রয়েছেন মরহু’\ম খালেদা জিয়া। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বিএনপির নির্বাচনি প্রচারে যদি তারেক রহমানের ছবি ব্যবহার করতে হয়, তাহলে ২২ জানুয়ারির আগেই তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রধানের দায়িত্বে আসতে হবে।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ (Akhtar Ahmed) বলেন, আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে—যিনি দলীয় প্রধান থাকবেন, নির্বাচনি প্রচারে কেবল তার ছবিই ব্যবহার করা যাবে। দলীয় প্রধান অনুপস্থিত থাকলে পরবর্তী সময়ে সেই পদে কাকে নিযুক্ত করা হবে, সেটি সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। যেহেতু ২২ জানুয়ারি থেকে প্রচার শুরু হবে, তখন যিনি দলীয় প্রধান থাকবেন, তার ছবিই ব্যবহার করা যাবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক জানান, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বাস্তবতা হলো—বর্তমানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানই। তবে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নি’\ধনজনিত শোক এখনো কাটিয়ে ওঠেনি দল। রাষ্ট্রীয়ভাবে তিনদিনের শোক পালন শেষ হলেও বিএনপি সাতদিনের শোক কর্মসূচি পালন করছে। সন্তান হিসেবে তারেক রহমানও এই মুহূর্তে চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে আগ্রহী নন বলে দলীয় সূত্রগুলো জানায়।

বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭-এর (গ)(২) উপধারায় বলা হয়েছে, চেয়ারম্যানের সাময়িক অনুপস্থিতিতে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে চেয়ারম্যানের সব দায়িত্ব পালন করবেন। একই ধারার (৩) উপধারা অনুযায়ী, যেকোনো কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। পরবর্তী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি চেয়ারম্যানের পদে বহাল থাকবেন। গঠনতন্ত্রের এই বিধান উল্লেখ করে দলের এক নীতিনির্ধারক বলেন, গঠনতান্ত্রিকভাবে কোনো প্রক্রিয়ার অপেক্ষা ছাড়াই তারেক রহমানই এখন দলের চেয়ারম্যান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) পর কে দলের প্রধান হবেন, সেটি গঠনতন্ত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। এটি একেবারেই ‘সেটেলড ম্যাটার’। একই প্রসঙ্গে স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ীই সবকিছু সম্পন্ন হবে, এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।

বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, গঠনতন্ত্র একটি দলের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনার আইনি কাঠামো। সেই কাঠামো বাস্তবে প্রয়োগ হয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারম্যানের শূন্যপদে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তবে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে বিবেচনা করে দলের নীতিনির্ধারণী সর্বোচ্চ ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানদের সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

তবে কাউন্সিল আহ্বান করে তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা প্রয়োজন কি না—এ প্রশ্নে স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নতুন করে চেয়ারম্যান নির্বাচনের ক্ষেত্রে কাউন্সিলের প্রয়োজন হয়। এই ক্ষেত্রেও কাউন্সিল হলে ভালো হতো, কিন্তু সামনে জাতীয় নির্বাচন থাকায় কাউন্সিল আয়োজনের মতো পর্যাপ্ত সময় বিএনপির হাতে নেই। তাতে গঠনতন্ত্রের কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না। কারণ গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তারেক রহমান চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন, আলাদা কোনো ঘোষণারও প্রয়োজন নেই।

২০০৯ সালে দলের জাতীয় সম্মেলনে তারেক রহমানকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে একটি মামলায় খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে তাকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করে বিএনপি। এর আগে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আটক হয়ে ১৮ মাস কারাবাসের পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মুক্তি পান তারেক রহমান। ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি সপরিবারে লন্ডন যান। এরপর দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর প্রবাসে থেকে দল পরিচালনা করেন তিনি। সর্বশেষ গত ২৫ ডিসেম্বর সপরিবারে দেশে ফেরেন তারেক রহমান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *