বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া-র প্রয়াণে শোকাহত দেশের নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। শোক ও স্মৃতিচারণায় ভরে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। সেই ধারাবাহিকতায় প্রয়াত নেত্রীকে ঘিরে আবেগঘন স্মৃতি শেয়ার করেছেন জনপ্রিয় ব্যান্ড মাইলস-এর ভোকালিস্ট হামিন আহমেদ।
ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টে হামিন লেখেন, “এর আগে কখনও বলা হয়নি, আজ শেয়ার করছি।”
তিনি জানান, ১৯৯৩–৯৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মাইলসকে আমন্ত্রণ জানান সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল রোডের বাসভবনে একটি ঘরোয়া সংগীত পরিবেশনার জন্য। সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে মাইলসের সদস্যরা হাজির হন এবং সেই স্মৃতিময় দিনের গল্পই আজ সামনে এনেছেন হামিন।
‘আমরা তখন মাইলসের নিয়মিত সদস্য—আমি, শাফিন, মানাম এবং সম্ভবত মাহবুব। প্রধানমন্ত্রী নিজে উপস্থিত থাকবেন জেনে আমরা রোমাঞ্চিত এবং কিছুটা নার্ভাসও ছিলাম,’ বলেন হামিন। তিনি জানান, তারেক রহমান ও তার বন্ধুরাও উপস্থিত ছিলেন এবং তারা মাইলসকে স্বাভাবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে গ্রহণ করেছিলেন।
কিন্তু দিনটির সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত আসে দুপুরের খাবারের সময়। সাউন্ডচেক চলাকালে দুপুর গড়িয়ে যায়। তখন জিয়া পরিবারের ঘনিষ্ঠরা তাদের বাইরে কোথাও খাওয়াতে নিতে চাইলে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, ‘না, ওরা এই বাড়িতেই খাবে। আমরা যা খাই, ওরাও তাই খাবে।’
এই আন্তরিকতায় অভিভূত হন হামিন। আরও বলেন, ‘আমরা ডাইনিং টেবিলে বসেছি, হঠাৎ দেখি প্রধানমন্ত্রী নিজে আমাদের খাবার তুলে দিচ্ছেন। আমি আমার প্লেটের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম—এটা কি সত্যি ঘটছে? সেই মুহূর্তে তার প্রতি আমার ভেতরে এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নেয়।’
তিনি যোগ করেন, ‘একজন প্রধানমন্ত্রী হয়েও তিনি কতটা মানবিক, মার্জিত ও বিনয়ী ছিলেন—এটা সেই দিন টের পেয়েছিলাম। আমাদের গান শুনে তিনি প্রশংসাও করেছিলেন। সেই দিনটি আমাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে।’
স্মৃতির পাতায় ফিরোজা বেগম
হামিন আহমেদের আরেকটি আবেগঘন স্মৃতি উঠে আসে ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তার মা, কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ফিরোজা বেগম-এর মৃত্যুর দিনে।
তিনি লেখেন, ‘আমার মায়ের মৃত্যুতে অনেকেই শহীদ মিনারে গিয়েছিলেন, কিন্তু বাসায় এসে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসেননি। রাষ্ট্রীয়ভাবে জানাজা বা দাফনের ব্যবস্থাও হয়নি। কেবল একজন মানুষ কোনো দ্বিধা করেননি—তিনি ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।’
‘তিনি শারীরিক কষ্ট সত্ত্বেও এসেছিলেন আমাদের ইন্দিরা রোডের বাসায়। আমাদের সঙ্গে অনেকক্ষণ সময় কাটিয়েছিলেন। মায়ের সঙ্গে তাঁর স্মৃতির গল্প শোনাতেও ভুল করেননি। তাঁর আচরণে মনে হচ্ছিল তিনি আমাদের পরিবারেরই একজন।’
স্মৃতিচারণের শেষে হামিন লিখেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন এক অসাধারণ, মার্জিত ও মানবিক হৃদয়ের মানুষ। সর্বোচ্চ সম্মান ও ভালোবাসা নিয়ে তিনি আমার স্মৃতিতে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।’
একটি কাকতালীয় বিষয়ের কথাও তুলে ধরেন হামিন—‘জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি যে বাসায় কাটিয়েছেন, সেই বাসার নাম ছিল ফিরোজা।’
৩০ ডিসেম্বর দীর্ঘদিন অসুস্থতার পর প্রয়াত হন খালেদা জিয়া। পরদিন তার জানাজায় অংশ নেয় হাজারো মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নেত্রীকে ঘিরে স্মৃতি, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার ঢল দেখা গেছে।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত খালেদা জিয়া প্রায় চার দশক ধরে নেতৃত্ব দিয়েছেন বিএনপি-কে। তিনি পাঁচবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য, তিনবার প্রধানমন্ত্রী এবং দুবার বিরোধী দলের নেতার দায়িত্ব পালন করেন।


