ঢাকা ও হবিগঞ্জে টানা আন্দোলনের মুখেও শেষ পর্যন্ত ‘আইনি জটিলতার’ কারণে মুক্তি পাননি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা সদস্যসচিব মাহদী হাসান। শনিবার (৩ জানুয়ারি) দিবাগত রাত ১২টার দিকে তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের বাসায় নেওয়া হলে নেতাকর্মীদের মধ্যে আশার সৃষ্টি হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত আদালত না বসায় মুক্তি পাননি মাহদী হাসান।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলার আহ্বায়ক আরিফ তালুকদারের ভাষ্য অনুযায়ী, জামিন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রাতেই একটি মাইক্রোবাসে করে ম্যাজিস্ট্রেটের বাসভবনে যান তিনি ও সংগঠনের মুখপাত্র আশরাফুল ইসলাম সুজনসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তবে সব প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত না থাকায় শেষ পর্যন্ত আদালত বসেনি এবং মাহদী হাসানকে মুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
আরিফ তালুকদার বলেন, “সেন্ট্রাল থেকে আমাদের জানানো হয়েছিল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মহোদয় মাহদীকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। প্রশাসনের আশ্বাসে শাহবাগের ব্লকেডও তুলে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, জাতীয় এই ইস্যুতে আমরা যখন ম্যাজিস্ট্রেটদের বাসায় গেলাম, ওনারা কেউ ন্যূনতম সৌজন্যবোধ দেখাননি বা রেসপন্স করেননি। পরে জেলা জজের প্রতিনিধির মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়েছে। ওনারা আইনি জটিলতার কথা বলছেন। আমরা এখনও আশাবাদী যে প্রশাসনের সহযোগিতায় মাহদীকে নিয়ে এখান থেকে বের হতে পারব। তা না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।”
আরিফ তালুকদার আরও জানান, পুলিশের ভাষ্যমতে রাষ্ট্রের কাজে বাধা দেওয়া এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের জন্য মাহদীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত তার মুক্তির উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
বানিয়াচংয়ের ঘটনা নিয়ে মাহদীর মন্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের ঘটনা কোনও মামলার বিষয় হতে পারে না, এটি জুলাই প্রক্লেমেশনের অন্তর্ভুক্ত।”
শনিবার (৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টার দিকে ডিবি পুলিশ শহরের শায়েস্তানগর এলাকার একটি বাসা থেকে মাহদী হাসানকে আটক করেছে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান শায়েস্তাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম। তবে পুলিশ এখনও জানায়নি মাহদীকে কোন মামলায় আটক করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মাহদী হাসানের আইনজীবী আব্দুল মালেক হৃদয় জানান, “রাত ১২টার দিকে পুলিশ প্রশাসনের গাড়িতে করে আমাদের সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে কোনো রেসপন্স না পাওয়ায় আমাদের ফিরে আসতে হয়েছে। যতটুকু শুনেছি, শায়েস্তাগঞ্জ থানায় পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে (পুলিশ অ্যাসল্ট) মামলা করা হয়েছে, যার অধিকাংশ ধারা জামিনযোগ্য। তবে আমরা এখনও মামলার কোনও কপি পাইনি। সকালে আদালত বসলে আইনি প্রক্রিয়ায় আমরা ব্যবস্থা নেব।”
মাহদী হাসানের আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা সদর মডেল থানার সামনে জড়ো হয়ে তার মুক্তির দাবি জানান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে থানার সামনে সেনাবাহিনী অবস্থান নেয়।
এদিকে মাহদী হাসানের মুক্তির দাবিতে হবিগঞ্জ ও ঢাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইনগত লড়াইয়ের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমেই তারা তাদের সহযোদ্ধার মুক্তি আদায় করবেন।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ভোররাতেও হবিগঞ্জ সদর থানার প্রধান ফটকে অবস্থান করছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা।
সম্প্রতি শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসির কক্ষে বসে মাহদী হাসানের একটি কথোপকথনের ভিডিও ভাইরাল হয়। সেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, “বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম।” এই মন্তব্যের পরই দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হয় এবং পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়। মূলত নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতাকে ছেড়ে দিতে গিয়ে ওসির সাথে এই বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়েছিলেন মাহদী।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্র জানায়, শায়েস্তাগঞ্জ সদর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহসভাপতি এনামুল হাসানকে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে আটক করে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। এনামুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন। এনামুলকে আটকের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা মুক্তির দাবিতে শুক্রবার দুপুরে থানা ঘেরাও করেন। এ সময় মাহদী হাসানের নেতৃত্বে একদল নেতাকর্মী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কক্ষে অবস্থান নেন। তখন ওসির সঙ্গে মাহদী হাসানের কথোপকথনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ওই ভিডিওতে শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি আবুল কালামের উদ্দেশে মাহদীকে বলতে শোনা যায়, “জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা সরকার গঠন করেছি। এই জায়গায় আপনারা আমাদের প্রশাসনের লোক। আপনারা আমাদের ছেলেদের গ্রেফতার করে নিয়ে এসেছেন। আবার আমাদের সঙ্গে বার্গেনিং করছেন। আপনি (ওসি) বলেছেন, আন্দোলনকারী হয়েছে তো কী হয়েছে?”
একপর্যায়ে মাহদী হাসান বলেন, “বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে কিন্তু আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম। ওই জায়গা থেকে উনি (ওসি) কোন সাহসে এটা (আন্দোলনকারী হয়েছে তো কী হয়েছে) বললেন। আমি স্ট্রিক্টলি এখানে আসছি। আমরা এতগুলা ছেলে ভাইসা আসছি নাকি?”
খবর পেয়ে শনিবার (৩ জানুয়ারি) বিকাল ৩টার দিকে হবিগঞ্জ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শহীদুল ইসলাম শায়েস্তাগঞ্জ থানায় যান। তার মধ্যস্থতায় বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে এনামুল হাসানকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।
মাহদী হাসান হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্র। তার বাড়ি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ভাদৈ এলাকায়।


