বিএনপি’র ৩১ দফা আর জুলাই জাতীয় সনদের সমন্বয়ে আসছে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার

পূর্ব-ঘোষিত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা এবং জুলাই জাতীয় সনদের সমন্বয়ে আটটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুত করা হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party – BNP)-এর আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহার। সাধারণ মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ বাস্তবতাকে সামনে রেখে ‘পরিবর্তনের রাজনীতি’ নিয়ে নির্বাচনি মাঠে নামতে চায় বিএনপি। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় পুরোদমে চলছে এই ইশতেহার প্রণয়নের কাজ।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের ইশতেহারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে—ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং ধর্মীয় নেতাদের জন্য উন্নয়নমূলক সেবা। এই আটটি খাতকে কেন্দ্র করেই বিএনপি এমন কিছু প্রতিশ্রুতি দিতে যাচ্ছে, যা নির্বাচনি রাজনীতিতে একটি নতুন ‘ডাইমেনশন’ সৃষ্টি করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান (Tarique Rahman)-এর সাম্প্রতিক সময়ে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্য ও দিকনির্দেশনাও ইশতেহারে প্রতিফলিত হচ্ছে।

ইশতেহার তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং বিএনপির নির্ভরযোগ্য একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের ইশতেহার শুধু রাজনৈতিক অঙ্গীকারের তালিকা নয়; বরং এটি হবে একটি বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আটটি বিষয়ের প্রতিশ্রুতি ভোটের মাঠে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, বাংলাদেশে অতীতে কিছু ক্ষেত্রে কার্ডভিত্তিক সুবিধা থাকলেও বিএনপি এবার যে কার্ড ব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা বলছে, সেখানে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ একাধিক নতুন খাত যুক্ত হচ্ছে—যা আগে কখনো দেখা যায়নি। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেসব সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা রয়েছে, সেগুলোর আদলে এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দলের নীতি-নির্ধারক ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক দলের ইশতেহার ঘোষণা করা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তিনি জানান, বিএনপির ইশতেহারের কেন্দ্রীয় ও ভিত্তিমূলক বিষয়গুলোর মধ্যে থাকবে—গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালী করা। একই সঙ্গে জনগণের হাতে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলাই হবে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, বিএনপি এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না, যা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ইতোমধ্যেই বলেছেন, ‘আমার একটা প্ল্যান আছে’। জনগণের জন্য বাস্তবসম্মত সেই পরিকল্পনাই বিএনপির নির্বাচনি রূপরেখা।

দলের আরেক নীতি-নির্ধারক, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম বলেন, পরিবর্তনের রাজনীতির আলোতেই এই আটটি খাতে কার্ডভিত্তিক সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। তিনি মনে করেন, এই উদ্যোগ আসন্ন নির্বাচনে নতুন মাত্রা যোগ করবে। তার ভাষায়, বিএনপির পরিকল্পনা অত্যন্ত স্পষ্ট এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোতে তা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন। অতীতে বিএনপি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে এবং সরকারে গেলে এবারও প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হবে। বিশেষ করে মানুষের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল বলেন, বাংলাদেশের মানুষকে আর ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়ার রাজনীতি চলতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সেই পথেই এগোচ্ছে। তিনি বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে পরিবর্তনের সুযোগ—যেখানে দায়িত্বশীল রাজনীতি, জনগণের অধিকার এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের যাত্রা শুরু হবে। তার মতে, আটটি বিষয়ের প্রতিশ্রুতিই জনগণের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনবে।

দলীয় সূত্র জানায়, আটটি গুরুত্বপূর্ণ খাতসহ ইশতেহারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি জনগণের সামনে তুলে ধরতে বিএনপি ইতোমধ্যেই বৃহৎ পরিসরে তথ্য-প্রচার কর্মসূচি শুরু করেছে। মূল দল এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের নিয়ে পাঁচটি টিম গঠন করা হয়েছে। নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে তারা এলাকায় এলাকায়, ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের কাছে বিএনপির প্রকৃত পরিকল্পনা তুলে ধরবেন। এতে ভুল তথ্য ছড়ানোর সুযোগ কমবে এবং ভোটাররা নিজেদের ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, আটটি বিষয়ের ওপর এই বিশেষ ফোকাস ভোটারদের মধ্যে আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারে। তার মতে, সাধারণ মানুষ—বিশেষ করে যারা অভাব ও ঝুঁকির মধ্যে জীবনযাপন করেন—রাষ্ট্রের কাছ থেকে এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা আগে কখনো কল্পনা করেননি। এখন যদি সম্ভাবনাময় কোনো রাজনৈতিক দল এসব সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে ভোটারদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আশার সঞ্চার হবে।

জানা গেছে, ইশতেহারে বিএনপির ৩১ দফার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো—নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাক্‌স্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধার—বিশদভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি জুলাই সনদের আলোকে মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা দেওয়ার পরিকল্পনাও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

ইশতেহারের অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি হিসেবে থাকছে ফ্যামিলি কার্ড। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে প্রতিটি পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নামে এই কার্ড দেওয়া হবে, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যায়। মাসে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা সমমূল্যের খাদ্য ও জরুরি পণ্য পেয়ে পরিবারগুলো সঞ্চয়ের সুযোগ পাবে, যা নারীর নেতৃত্বে ছোট উদ্যোগ তৈরির পথ খুলে দেবে।

কৃষক কার্ড চালুর মাধ্যমে কৃষকদের জন্য স্বল্পমূল্যে সার, উন্নত বীজ, কৃষিপ্রযুক্তি, সহজ ঋণ এবং বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়বে, কৃষকের আয় বাড়বে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।

স্বাস্থ্য খাতে প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে শক্তিশালী প্রাইমারি হেলথ কেয়ার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্তত এক লাখ দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যার বড় অংশ নারী, যাতে নারী ও শিশুদের সেবা সহজ হয়।

শিক্ষা ক্ষেত্রে মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে চাহিদাভিত্তিক, দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হবে। শিল্প ও কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে পাঠ্যক্রমের বাস্তব সংযোগ তৈরি করে শিক্ষাকে সরাসরি কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে স্কুল ও কলেজে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করা, পর্যাপ্ত ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রতিভা বিকাশের মাধ্যমে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

পরিবেশ সুরক্ষায় নবায়নযোগ্য শক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং বাড়ানোর পাশাপাশি ২৫ হাজার কিলোমিটার খাল-নদী খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনাও রয়েছে। কর্মসংস্থানে এসএমই, ব্লু ইকোনমি, আইসিটি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্টার্টআপ খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

ধর্মীয় নেতাদের জন্য মাসিক সম্মানি, উৎসবকেন্দ্রিক সহায়তা এবং জীবনমান উন্নয়নের ব্যবস্থাও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত থাকছে।

তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, কৃষক ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না, তরুণরা বেকার। এখন সময় এসেছে এমন রাজনীতির, যা কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাস করবে। বিএনপি সেই লক্ষ্য নিয়েই জনগণের জীবনোন্নয়নমূলক পরিকল্পনা তৈরি করেছে, যাতে ক্ষমতায় গেলে সঙ্গে সঙ্গেই কাজ শুরু করা যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *