রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রস্তাব দিলেও ভারতে বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলতে যেতে রাজি নয় বিসিবি

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রস্তাব এলেও ভারতের মাটিতে খেলতে অনিচ্ছুক অবস্থানেই রয়েছে বাংলাদেশ। আসন্ন টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে ম্যাচ না খেলার সিদ্ধান্তে অনড় থাকার বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (Bangladesh Cricket Board – BCB)। বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা বাড়ছে, ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (International Cricket Council – ICC) বিসিবির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার (৬ ডিসেম্বর) অনলাইনে দুই পক্ষের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

আইসিসির যেকোনো বড় টুর্নামেন্টের আগে আয়োজক দেশ ও অংশগ্রহণকারী বোর্ডগুলোর মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী, কোনো দেশ যদি পরবর্তীতে টুর্নামেন্ট বা নির্দিষ্ট ম্যাচে অংশগ্রহণ থেকে সরে আসে, তবে আইসিসির কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে হয়। সাধারণত এক্ষেত্রে সরকারি নিষেধাজ্ঞা কিংবা জাতীয় নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগকে সবচেয়ে শক্ত ও বৈধ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অতীতেও এমন একাধিক নজির রয়েছে। ভারত–পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বাতিল কিংবা ভেন্যু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একই যুক্তি দেখানো হয়েছিল, যা আইসিসি মেনে নিয়েছে। চলমান বিশ্বকাপেই পাকিস্তানের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের সিদ্ধান্তও সেই বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ। সেই ধারাবাহিকতায় এবার বিসিবিও নিরাপত্তার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান নিতে চায়।

ভারত সফর নিয়ে বাংলাদেশের প্রধান উদ্বেগ সরাসরি ‘নিরাপত্তা’। বিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার মনে করছে—বর্তমান বাস্তবতায় ভারতে খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। এই অবস্থায় বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপ উপলক্ষে ভারতে যেতে অনিচ্ছুক এবং বোর্ড চায় তাদের ম্যাচগুলো নিরপেক্ষ বা অন্য কোনো দেশে আয়োজন করা হোক।

এই উদ্বেগ নতুন করে তীব্র হয়েছে মোস্তাফিজুর রহমান (Mustafizur Rahman)-কে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনার পর। রাজনৈতিক ও উগ্র সংগঠনের হুমকির প্রেক্ষাপটে বিসিসিআই যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিসিবির মতে, একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে বিশ্বকাপের মতো আসরে খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও দর্শক মিলিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে—এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনো মেলেনি।

বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম (Aminul Islam) সোমবার স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এই মুহূর্তে ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলা নিরাপদ বলে মনে হচ্ছে না। তিনি মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে ‘অসম্মানজনক’ বলেও উল্লেখ করেন। আইসিসির মধ্যস্থতায় আজকের বৈঠকে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (Board of Control for Cricket in India – BCCI) বাংলাদেশের জন্য রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দেওয়ার প্রস্তাব দিতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। তবে বিসিবি সূত্র বলছে, কাগুজে বা প্রতিশ্রুতিনির্ভর নিরাপত্তায় বোর্ডের আস্থা নেই, ফলে এতে সম্মত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

পুরো পরিস্থিতি এখন আয়োজক হিসেবে বিসিসিআইয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। কারণ, টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী সব দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আয়োজক দেশেরই দায়িত্ব। আইসিসির বর্তমান প্রধান ভারতীয় হওয়ায় বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও সীমিত। ভারতীয় কিছু গণমাধ্যম জানিয়েছে, বাংলাদেশের ম্যাচ অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাবে আইসিসি শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো, বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র এক মাস আগে ভেন্যু পরিবর্তন করা অত্যন্ত জটিল কাজ। সূচি পুনর্বিন্যাস, সম্প্রচার স্বত্ব, প্রতিপক্ষ দলগুলোর সম্মতি—সবকিছু মিলিয়ে এটি বড় চ্যালেঞ্জ। গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের চারটি ম্যাচ রয়েছে, যেগুলো নতুন করে সাজানো সহজ নয়।

যদি আইসিসি বিসিবির প্রস্তাবে সায় না দেয় এবং বাংলাদেশ দলও ভারতে খেলতে না যায়, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী প্রতিপক্ষ দলগুলো ওয়াকওভার পেতে পারে। এমনকি কঠোর শাস্তির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবুও বিসিবির বিশ্বাস, জাতীয় নিরাপত্তার মতো যৌক্তিক ও বাস্তব উদ্বেগের কারণে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে বড় কোনো শাস্তির মুখে পড়তে হবে না। কারণ, এই উদ্বেগ কেবল কাগুজে নয়—বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও যুক্তিসংগত বলেই বিবেচিত হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *