আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি (BNP) সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে অন্তত ৭৯টি আসনে দলটির নেতারা স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে অন্তত ৪৬টি আসনে তাঁরা শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। এই ৪৬ আসনের অন্তত ১৭ টি আসনে মূল লড়াইয়ে অতীব জয়ী হতে পারেন এমন অবস্থানে আছেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা।এদের কারণে সমঝোতার আওতায় নির্বাচনে অংশ নেওয়া কিংবা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে লড়া প্রার্থীরা ভোটের মাঠে পড়েছেন তীব্র চাপে।
স্থানীয় নেতাকর্মী ও ভোটারদের অনেকেই বলছেন, বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের জয়ী হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে এই বিদ্রোহীদের কারণে বিএনপি’র ভোট ভাগ হয়ে গিয়ে ফায়দা লুটতে পারে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমর্থিত প্রার্থীরা।
শুরুতে ১১৭টি আসনে প্রায় ১৯০ জন দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। পরে নানা পর্যায়ে আলোচনা, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে অনেকে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করলেও শেষ পর্যন্ত ৭৯টি আসনে ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে থেকে যান। কিছু আসনে একাধিক বিদ্রোহী, আবার কোথাও কোথাও একজন প্রার্থী একাধিক আসনে লড়ছেন।
বাগেরহাটে চার আসনেই বিদ্রোহ
বাগেরহাট (Bagerhat) জেলার চারটি আসনে সব কটিতেই বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। বিশেষ করে বাগেরহাট-১, ২ ও ৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক এমপি এম এ এইচ সেলিম। যদিও বর্তমানে তিনি দলের কোনো পদে নেই। বাগেরহাট-১ আসনে তাঁর পাশাপাশি প্রার্থী হয়েছেন শেখ মাছুদ রানা। এ কারণে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বাগেরহাট-৪ আসনে রয়েছেন সাবেক আহ্বায়ক কাজী খায়রুজ্জামান, তিনিও বহিষ্কৃত।
প্রচার-প্রচারণায় সক্রিয় সেলিম দাবি করেছেন, “দলীয় প্রার্থীরা এখানে পরিচিত নন, তাঁদের দিয়ে জামায়াতকে হারানো যাবে না। তাই দলের স্বার্থেই আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছি।”
ঢাকা ও কুমিল্লায় বিভক্তি
ঢাকা-১৪ (Dhaka-14) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছেন সানজিদা ইসলাম তুলি। তবে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এস এ সিদ্দিক সাজু, যিনি বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত। এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমানও আছেন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে।
কুমিল্লা-২ (Comilla-2) আসনে (হোমনা-তিতাস) বিএনপি’র প্রার্থী সেলিম ভূঁইয়ার বিপরীতে স্বতন্ত্র লড়ছেন আবদুল মতিন খান, যিনি একসময় খালেদা জিয়ার এপিএস ছিলেন। তাঁকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাঁর পক্ষে মাঠে রয়েছেন পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা, এবং ভোটের মাঠে দলীয় দ্বন্দ্ব সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে।
পাবনা ও উত্তরাঞ্চলে বিভাজন
পাবনা-৪ (Pabna-4) আসনে চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিবের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী জাকারিয়া পিন্টু লড়ছেন। একইভাবে পাবনা-৩ আসনে দলের প্রার্থী কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন সদ্য বহিষ্কৃত কে এম আনোয়ারুল ইসলাম। ভোটের মাঠে তাঁদের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট।
সমঝোতা আসনেও বিদ্রোহ
যুগপৎ আন্দোলনের অংশীদারদের জন্য বিএনপি আটটি আসন ছেড়েছে। কিন্তু এর মধ্যে চারটিতেই বিদ্রোহী প্রার্থীরা রয়েছেন।
ঢাকা-১২ (Dhaka-12) আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের বিপরীতে লড়ছেন বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা সাইফুল আলম (নীরব)।
পটুয়াখালী-৩ (Patuakhali-3) আসনে নুরুল হক নুর (Nurul Haque Nur) বিএনপি’র সমঝোতার প্রার্থী হলেও তাঁর বিপরীতে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন হাসান মামুন। স্থানীয় বিএনপি কমিটি তাঁর পক্ষে কাজ করায় দুই উপজেলার কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (Brahmanbaria-2) আসনে জমিয়তের প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবিবের বিপরীতে লড়ছেন রুমিন ফারহানা ও এস এন তরুণ দে। রুমিনের পক্ষে কাজ করায় শাহজাদাপুর ইউনিয়নসহ আশপাশের নেতাকর্মীদের বহিষ্কার করা হয়েছে, তবুও তাঁরা প্রচারে সক্রিয়।
নারায়ণগঞ্জ-৪ (Narayanganj-4) আসনে জমিয়তের প্রার্থী মনির হোসেন কাসেমীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্রভাবে লড়ছেন বহিষ্কৃত নেতা মোহাম্মদ শাহ আলম ও সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিন।
শেষ পর্যন্ত কে কার ক্ষতি করছেন?
বিভিন্ন আসনে এভাবে বিদ্রোহী প্রার্থীরা দলের প্রার্থীদের চাপের মুখে ফেলেছেন, বিভক্ত করেছেন কর্মীদের, এমনকি ভোট কাটাকাটির ফলে জামায়াত ও সমঝোতার বাইরের দলগুলোও সুবিধা পাচ্ছে। নির্বাচনের ফলাফলে এই বিদ্রোহ কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে।


