স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (Mirza Fakhrul Islam Alamgir)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর সামনে খুলছে প্রশাসনিক নেতৃত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দুয়ার।
এর আগে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদে তিনি প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় এবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তাঁর হাতে যেতে পারে—এমন আভাসেই রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Dhaka) থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন এবং ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন তিনি।
সরকারি দায়িত্বের অংশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও আয়-ব্যয় পরীক্ষণ অধিদপ্তরে নীরিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এসএ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর বারী পদত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি পুনরায় শিক্ষকতা পেশায় ফিরে গিয়ে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন।
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মির্জা ফখরুল। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন)-এর সদস্য ছিলেন এবং সংগঠনটির এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন। ছাত্ররাজনীতির সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
১৯৮৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৮ সালের ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party – BNP)-এ যোগ দেন।
১৯৯২ সালে তিনি বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালের পঞ্চম এবং ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-1 আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। তবে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে জয়লাভ করে সংসদে প্রবেশ করেন।
২০০১ সালের নভেম্বরে বিএনপি সরকার গঠন করলে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া (Khaleda Zia)-এর দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় তিনি প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী রমেশ চন্দ্র সেনের কাছে পরাজিত হন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬—দুই আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান এবং বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচিত হন। তবে শপথ গ্রহণ না করায় নির্বাচন কমিশন তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করে এবং সেখানে উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। ২০১১ সালের ২০ মার্চ তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেন মৃত্যুবরণ করলে দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা করেন। পরে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে তিনি মহাসচিব হিসেবে নির্বাচিত হন।
দীর্ঘ ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও দলীয় নেতৃত্বের পথ পেরিয়ে এখন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর—যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


