ত্রয়োদশ সংসদে ৯১ শতাংশের বেশি এমপি কোটিপতি, সম্পদ বৈষম্যে নতুন প্রশ্ন

সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন–এ বিজয়ী ২৯৭ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২৭১ জনের সম্পদের পরিমাণ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ বর্তমান সংসদে নির্বাচিত এমপিদের ৯১ দশমিক ২৫ শতাংশই কোটিপতি। এই তথ্য তুলে ধরেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।

বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাব–এর জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তথ্য উপস্থাপন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। সুজনের সম্পাদক অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদারের সঞ্চালনায় সংগঠনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক দিলীপ কুমার সরকার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সম্পদসংক্রান্ত বিশদ তথ্য উপস্থাপন করেন।

উপস্থাপিত তথ্যে দেখা যায়, কোটিপতি এমপিদের মধ্যে ১৮৭ জনের সম্পদ ৫ কোটি টাকার বেশি, যা মোট নির্বাচিতদের ৬২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। অর্থাৎ শুধু কোটিপতি নয়, বড় অঙ্কের সম্পদের মালিকদের উপস্থিতিও সংসদে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

দলভিত্তিক বিশ্লেষণে জানানো হয়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে নির্বাচিত ২০৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২০১ জন, অর্থাৎ ৯৬ দশমিক ১৭ শতাংশই কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত ৬৮ জনের মধ্যে ৫২ জন (৭৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ) কোটিপতি।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে মাত্র ২ জনের সম্পদ ২৫ লাখ টাকার কম, যা শতাংশের হিসাবে ০ দশমিক ৬৭। সম্পদের ঘর পূরণ না করা ৩ জনকে যুক্ত করলে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ জনে, অর্থাৎ ১ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

সুজনের বিশ্লেষণে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সঙ্গে নির্বাচিতদের তুলনাও তুলে ধরা হয়। নির্বাচনে অংশ নেওয়া মোট প্রার্থীদের মধ্যে কোটিপতির হার ছিল ৫৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ। ২৫ লাখ টাকার কম সম্পদের মালিক প্রার্থীর হার ছিল ১৮ দশমিক ৭১ শতাংশ (৩৭৯ জন)। সম্পদের ঘর পূরণ না করা ৫৮ জনসহ এ হার দাঁড়ায় ২১ দশমিক ৫৭ শতাংশ (৪৩৭ জন)। কিন্তু নির্বাচিতদের মধ্যে স্বল্প সম্পদের মালিকদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন–এর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, তখন বিজয়ীদের মধ্যে কোটিপতির হার ছিল ৮৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে ৯১ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, দ্বাদশ সংসদে ২৫ লাখ টাকার কম সম্পদের মালিক বিজয়ী ছিলেন ৩ দশমিক ০১ শতাংশ; এখন তা কমে ০ দশমিক ৬৭ শতাংশে নেমে এসেছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়, স্বল্প সম্পদের অধিকারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও বিজয়ের হার ক্রমেই কমছে। বিপরীতে, অধিক সম্পদের মালিকদের অংশগ্রহণ এবং নির্বাচিত হওয়ার হার বাড়ছে। ফলে সংসদের আর্থিক কাঠামো আরও বেশি সম্পদশালীদের দখলে যাচ্ছে—এমন ইঙ্গিতই মিলছে উপাত্তে।

নবনির্বাচিতদের মধ্যে শীর্ষ ১০ সম্পদশালী এমপির তালিকাও তুলে ধরা হয়। শরীয়তপুর–১ আসন থেকে বিএনপি মনোনীত সাঈদ আহমেদের মোট সম্পদ ১১৯৯ কোটি ৯৫ লাখ ৫৬ হাজার ১১০ টাকা। ফেনী–৩ আসনের আবদুল আউয়াল মিন্টুর সম্পদ ৯৪৬ কোটি ৮১ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪৭ টাকা। কুমিল্লা–৮ আসনের জাকারিয়া তাহেরের ৭৭০ কোটি ৮৯ লাখ ১৭ হাজার ৭৯৪ টাকা। বগুড়া–৫ আসনের গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের ৬১৩ কোটি ৫৬ লাখ ৮৫ হাজার ৯৯৭ টাকা। শরীয়তপুর–২ আসনের মো. সফিকুর রহমান (কিরণ)–এর ৫৫৭ কোটি ৬৪ লাখ ৯১ হাজার ৪৯০ টাকা।

এ ছাড়া ময়মনসিংহ–১১ আসনের ফখর উদ্দিন আহমেদের ৪৬৫ কোটি ১৪ লাখ ৪৫ হাজার ৯৪২ টাকা, মৌলভীবাজার–৩ আসনের নাসের রহমানের ৩৮০ কোটি ৬৪ লাখ ৭৬ হাজার ৬৬৯ টাকা, চাঁদপুর–২ আসনের মো. জালাল উদ্দিনের ৩৬৪ কোটি ১২ লাখ ২০ হাজার ১০৬ টাকা, ঢাকা–৮ আসনের মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদের ৩২৫ কোটি ৯৪ লাখ ৮৩ হাজার ২৬৬ টাকা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চাঁদপুর–৪ আসন থেকে নির্বাচিত মো. আবদুল হান্নানের সম্পদ ৩১৮ কোটি ১৮ লাখ ৪২ হাজার ৪২৮ টাকা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *