একদিনেই ১২ সচিবের বিদায়, প্রশাসনে বড় রদবদলে নতুন নিয়োগের অপেক্ষা

নতুন সরকার গঠনের পর প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদলের পথে হাঁটছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই এক দিনে এক ডজন সচিবকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় সচিবালয়জুড়ে তৈরি হয়েছে আলোড়ন। ইতোমধ্যে বিগত সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া ৯ জন সচিবের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি তিনজন সচিবকে ওএসডি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় (Ministry of Public Administration)-এ সংযুক্ত করা হয়েছে।

সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, শূন্য হয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে চলতি সপ্তাহেই নতুন নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে। প্রশাসনিক আদেশে যাদের মূল দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে তারা হলেন—মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাইফুল্লাহ পান্না এবং ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কামাল উদ্দিন।

অন্যদিকে, অন্তবর্তীকালীন সরকারের আমলে দেওয়া চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল হওয়া ৯ জনের তালিকাও দীর্ঘ। তাদের মধ্যে রয়েছেন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী, জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক সিদ্দিক জোবায়ের, বমি আপিল বিভাগের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ, পরিকল্পনা কমিশনের আলোচিত সিনিয়র সচিব ড. মো. মোখলেসুর রহমান, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) এম এ আকমল হোসেন আজাদ, ড. কাইয়ুম আরা বেগম এবং বিশ্ব ব্যাংক (World Bank)-এর বিকল্প নির্বাহী পরিচালক বেগম শরিফা খান।

সচিবালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, শূন্য হওয়া ১২টি পদে নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে অতীতে পদোন্নতি ও পদায়নে ‘বঞ্চিত’ এবং ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে যারা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাননি, তাদের মধ্য থেকেই নতুন সচিব বাছাইয়ের চিন্তা চলছে। প্রশাসনের অভ্যন্তরে ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party)-ঘনিষ্ঠ বা নিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত দক্ষ কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ এ দফায় শীর্ষ পদে ফিরতে পারেন।

এরই মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের দায়িত্বে আসতে পারেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়া (Begum Khaleda Zia)-র এপিএস এবং নবম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. শামসুল আলম। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে পদায়নবঞ্চিত এই কর্মকর্তাকে অন্তর্বর্তী সরকার কোনো মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব দেয়নি বলে জানা গেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রেসিডেন্টের আদেশে তিনি পুনরায় চাকরিতে বহাল হন। যদিও ২০২২ সালেই তাকে সিনিয়র সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে সার-সংক্ষেপ প্রধান উপদেষ্টা ও প্রেসিডেন্টের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল, তবুও তাকে পদায়ন করা হয়নি।

গত জুলাই মাসে শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জুবায়ের অপসারণের পর শামসুল আলমকে ওই পদে দেওয়ার আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেখানে রেহানা পারভীনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাকে পদায়নের দাবিতে একদল শিক্ষার্থী বাংলাদেশ সচিবালয়ে গিয়ে অর্থ উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র সচিব ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে স্মারকলিপিও দেয়। অভিযোগ রয়েছে, শুধু খালেদা জিয়ার পিএস ছিলেন—এই কারণেই তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

২০০৮ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ প্রভাবশালী ৬২ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ সব ইমিগ্রেশনে তালিকা পাঠানো হয়েছিল। সে সময় হয়রানির শিকার হয়েছিলেন শামসুল আলমও।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, নতুন নিয়োগের তালিকা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সবুজ সংকেত পেলেই যে কোনো মুহূর্তে প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে। প্রশাসনে এই বড় রদবদল—যাকে অনেকে ‘মেজর ওভারহলিং’ বলছেন—নিয়ে সচিবালয়জুড়ে চলছে জল্পনা, কৌতূহল আর অপেক্ষা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *