সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ‘ভোটের অঙ্ক’ – কার পক্ষে ভারী পাল্লা?

ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণসহ দেশের মোট ছয়টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরপরই রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বিরোধী জোটের দলগুলো অভিযোগ তোলে—সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচন এড়িয়ে যেতে চায়, কারণ সাম্প্রতিক সংসদ নির্বাচনের “ভোটের অঙ্ক” তাদের জন্য আশাব্যঞ্জক নয়। এই বক্তব্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলে চলছে তর্ক-বিতর্ক।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (Jatiya Nagorik Party)-এর মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, শহরগুলোতে ভোটের অঙ্ক কষেই সরকারি দল নির্বাচন দেওয়ার সাহস পাচ্ছে না। যে দল অন্তর্বর্তী সরকারকে এতদিন “বিনা ভোটের সরকার” বলে সমালোচনা করেছে, তারাই এখন বিভিন্ন সিটিতে বিনা ভোটে মেয়র বসাচ্ছে—এমন অভিযোগও তোলেন তিনি। তার বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন করে রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

এই প্রেক্ষাপটে সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনের চিত্র বেশ স্পষ্ট ভাবেই ফুটে ওঠে। কেমন সেই অঙ্ক ?

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন
ঢাকা-৬, ৭, ৮, ৯ ও ১০ সংসদীয় আসন নিয়ে মূলত গঠিত ঢাকা দক্ষিণ। কিছু অংশ সিটি এলাকার বাইরে থাকলেও মোট ভোটের হিসেবে তা খুব বড় প্রভাব ফেলে না। সাম্প্রতিক নির্বাচনে এই পাঁচটি আসনের সবকটিতেই জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP) জোট। তাদের মোট প্রাপ্ত ভোট ৪,৩৪,৫৩০। বিপরীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (Bangladesh Jamaat-e-Islami) জোট পেয়েছে ৩,৩৮,৯৬৩ ভোট। ব্যবধান প্রায় এক লাখ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই পাঁচ আসনের অন্তত দুটিতে বিএনপির শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। ফলে দলীয় ভোট এক থাকলে ব্যবধান আরও বাড়তে পারত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সেই হিসাবে মেয়র নির্বাচনেও দক্ষিণ সিটি বিএনপির জন্য তুলনামূলক নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন
ঢাকা-১১ থেকে ১৭—এই সাতটি আসন নিয়ে গঠিত উত্তর সিটি। এখানে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। সাত আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জয় পেয়েছে জামায়াত জোট; তাদের মোট ভোট ৫,৭৭,০৮৪। বিএনপি জোট জয় পেয়েছে মাত্র দুটি আসনে, তাদের ভোট ৫,১৬,১৮৯। ব্যবধান প্রায় ৬০ হাজার। তবে তিনটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা সম্মিলিতভাবে প্রায় ৭০ হাজার ভোট পেয়েছেন। অর্থাৎ দলীয় ঐক্য সুসংহত থাকলে ফল ভিন্ন হতে পারত। ফলে মেয়র নির্বাচনে এখানে লড়াই কঠিন হওয়ার আভাস স্পষ্ট, বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসন না হলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন
চট্টগ্রাম-৮, ৯, ১০ ও ১১ আসন নিয়ে গঠিত এই সিটিতে চারটিতেই বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়েছে বিএনপি জোট। তাদের মোট ভোট ৫,০১,৩৩৪; জামায়াত জোট পেয়েছে ২,৬০,৯৭১। ব্যবধান প্রায় আড়াই লাখ। সাংগঠনিক ও ভোটের দিক থেকে এই সিটিতে বিএনপির অবস্থান দৃঢ় বলেই ধরা হচ্ছে। মেয়র নির্বাচনেও সেই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন
গাজীপুর-১, ২ ও ৩ আসনের বড় অংশ নিয়ে গঠিত এই সিটি কর্পোরেশনেও তিনটি আসনেই জয় বিএনপি জোটের। মোট ভোট ৫,৫৯,৬৩৭; জামায়াত জোট পেয়েছে ৩,৯০,৯৪২। ব্যবধান প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার। তবে দুটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রায় ৪০ হাজার ভোট পেয়েছেন। দলীয় ঐক্য বজায় থাকলে মেয়র পদেও বিএনপি এগিয়ে থাকবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন
নারায়ণগঞ্জ-৪ ও ৫ আসনভিত্তিক এই সিটিতে মিশ্র ফলাফল দেখা যায়। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জয় পেয়েছে জামায়াত জোট প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। আর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন বিএনপি জোটের জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থী। এখানে ভোটের ব্যবধান ছিল 20 হাজারের মতো। তবে এখানে ছিল বিএনপির শক্ত বিদ্রোহী প্রার্থী মোঃ শাহ আলম , যাকে প্রথমে মনোনয়ন দেওয়া হলেও জোটের স্বার্থে বাদ দেওয়া হয়। এখানে তিনি ভোট পান প্রায় ৪০ হাজার। আর অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপি বেশ বড় ব্যবধানে জয়ী হলেও এখানেও দলটিকে বিদ্রোহ প্রার্থীর মুখমুখি হতে হয়। এই আসনেও বিদ্রোহী প্রার্থী ভোট পান প্রায় ৩৫ হাজার। সব মিলিয়ে দলীয় বিভাজন বড় ফ্যাক্টর হলেও সামগ্রিক হিসেবে মেয়র নির্বাচনে বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে।

খুলনা সিটি কর্পোরেশন
খুলনা-২ আসনের বড় অংশ এবং খুলনা-৩ আসনের নগর অংশ খুলনা সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত। তবে খুলনা-৩ আসনের কিছু অংশ সিটি এলাকার বাইরে। সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ আসনে জয় পেয়েছে জামায়াত জোট প্রার্থী । আর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন বিএনপি প্রার্থী। এখানে ভোটের ব্যবধান ছিল সাড়ে পাঁচ হাজারের মতো। মূলত এখানে বিএনপি’র অন্তকোন্দলেই বিএনপি’র পরাজয় ঘটে বলে জানান স্থানীয়রা। আর অন্যদিকে খুলনা-৩ আসনে জয় পান বিএনপি প্রার্থী আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী- এখানে জয় পরাজয় নির্ধারিত হয় আট হাজারের কিছু বেশি ভোটের ব্যবধানে। সব কিছুকে বিবেচনায় নিয়ে বলা যায় মেয়র নির্বাচনে খুলনা সিটি কর্পোরেশনে বেশ হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হিতে পারে।

রংপুর সিটি কর্পোরেশন
রংপুর-৩ আসনের নগর অংশ সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত। তবে আসনের কিছু গ্রামীণ এলাকা (সদর উপজেলার অংশ) সিটি কর্পোরেশনের বাইরে। এই আসনে বেশ সহজ জয় পান জামায়াতের প্রার্থী। তিনি ৯০ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থীকে পরাজিত করেন। একসময় জাতীয় প্রার্থীর ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত এই আসনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ভোট পান ৯০,৩২৯। এখানে বিএনপি’র তেমন কোন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জামায়াতের সাথে জাতীয় পার্টির কিছুটা লড়াই হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

সিলেট সিটি কর্পোরেশন
সিলেট-১ সংসদীয় আসনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সিলেট সিটি কর্পোরেশনের বাইরে, বিশেষ করে সদর উপজেলার গ্রামীণ এলাকাগুলো। অর্থাৎ এই আসনটি পুরোপুরি নগরভিত্তিক নয়; এতে শহর ও গ্রামের মিশ্র ভোটার কাঠামো রয়েছে। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বিএনপি প্রার্থী বড় ব্যবধানে জয় লাভ করেন। তিনি প্রায় ৪০ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জামায়াত প্রার্থীকে পরাজিত করেন, যা স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণে স্পষ্ট বার্তা দেয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যবধান শুধু গ্রামীণ অংশে নয়, শহরাঞ্চলেও বিএনপির শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত বহন করে। ফলে সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় নির্বাচন হলে বিএনপি প্রার্থীর জন্য সেটি তুলনামূলকভাবে সহজ প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বরিশাল সিটি কর্পোরেশন
বরিশাল-৫ সংসদীয় আসনের নগর অংশ বরিশাল সিটি কর্পোরেশন-এর অন্তর্ভুক্ত হলেও আসনের কিছু গ্রামীণ এলাকা সিটি এলাকার বাইরে রয়েছে। ফলে এখানে শহর ও গ্রামের ভোটারদের আলাদা রাজনৈতিক আচরণ নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এই আসনটি জামায়াতে ইসলামী জোটের বাইরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে ছেড়ে দেয়, দলটির সিনিয়র নায়েবে আমীর সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করিম-এর সম্মানে। তবে কৌশলগত এই সিদ্ধান্ত নির্বাচনী ফলাফলে প্রত্যাশিত সুফল আনতে পারেনি। সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী মোঃ মজিবর রহমান সরওয়ার-এর কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হন। এই ফলাফল স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটব্যাংকের দৃঢ় অবস্থানকে স্পষ্ট করে। বিশ্লেষকদের মতে, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ভোটের প্রবণতা বিবেচনায় নিলে সেখানে বিএনপি প্রার্থীর জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুলনামূলকভাবে অনুকূল হতে পারে। তবে চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে প্রার্থী নির্বাচন, জোট সমীকরণ, ভোটার উপস্থিতি এবং স্থানীয় ইস্যুর ওপর।

কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন
কুমিল্লা-৬ আসনে প্রায় এক লাখ ভোটে বিএনপি প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয় জামায়াত। তবে সাবেক মেয়র সাক্কু যদি বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকেন, তাহলে সমীকরণ পাল্টে যেতে পারে। তাতে জামায়াত কিছুটা সুবিধা পেতে পারে, যদিও সাংগঠনিকভাবে বিএনপি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন
রাজশাহী-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী প্রায় ২৮ হাজার ভোটে জয় পেলেও লড়াই ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। জামায়াতের সংগঠন এখানে দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তুলেছে। ফলে মনোনয়ন ও জোট কৌশল ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।

ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন
ময়মনসিংহ-৪ আসনে বিএনপি জয় পায় মাত্র সাড়ে সাত হাজার ভোটে। জেলার অন্যান্য আসনে দুর্বল হলেও এখানে জামায়াতের সংগঠন শক্তিশালী। ফলে মেয়র নির্বাচনেও হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সব মিলিয়ে “ভোটের অঙ্ক” এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কোথাও স্পষ্ট প্রাধান্য, কোথাও বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রভাব, কোথাও সংগঠনের শক্ত ঘাঁটি—প্রতিটি সিটিতে আলাদা বাস্তবতা। তবে সব মিলিয়ে বিরোধী দল যতই “ভোটের অঙ্ক” নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিক না কেন, মাঠের বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল, ভোটের ব্যবধান এবং বিভিন্ন আসনের ভোট-প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—ঘোষিত অঙ্ক ও বাস্তব ফলাফলের মধ্যে বেশ পার্থক্য রয়েছে।

সে বিবেচনায় ধারণা করা যায়, যে অঙ্ক তুলে ধরে বিরোধীরা রাজনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা করছে, তা হয়তো তাদের অনুকূলে পুরোপুরি যায় না। শেষ পর্যন্ত ভোটের অঙ্ক কাগজে নয়, ব্যালটেই চূড়ান্ত হয়—এটাই রাজনৈতিক বাস্তবতা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *