ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলী খামেনির মৃত্যুতে উত্তরসূরি কে?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলী খামেনি নিহত হওয়ার খবর ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সময় শনিবার এই হামলায় তিনি নিহত হন। একই হামলায় তাঁর মেয়ে, নাতি, পুত্রবধূ ও জামাতাও নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে।

সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লা আলী খামেনি ছিলেন দেশটির সামরিক বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ। রাষ্ট্রের সামরিক, বিচারিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে তাঁর ছিল চূড়ান্ত কর্তৃত্ব। ফলে তাঁর অনুপস্থিতি শুধু নেতৃত্বের শূন্যতাই তৈরি করেনি, বরং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

ইসলামি বিপ্লব থেকে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইরানে রেজা শাহ পাহলভীর রাজতন্ত্র উৎখাত হয়। সেই বিপ্লবের পর দেশটিতে ধর্মীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং চালু হয় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার শাসনব্যবস্থা। এই কাঠামোয় ‘আয়াতুল্লা’ উপাধি শিয়া মুসলমানদের কাছে একজন জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতার মর্যাদা বহন করে।

ইসলামি বিপ্লবের পর আলী খামেনি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ইসলামিক রেভোলিউশন গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালের জুনে রুহুল্লাহ খোমেনি (Ruhollah Khomeini) মারা গেলে, বিশেষজ্ঞ পরিষদ—ধর্মযাজকদের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান—সংবিধান সংশোধন করে আলী খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। সেই থেকেই তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।

এখন উত্তরসূরি কে?

আলী খামেনির নিহতের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কে হচ্ছেন তাঁর উত্তরসূরি? এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। হামলার দুই সপ্তাহ আগে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ইঙ্গিত দিয়েছিল, যদি খামেনি অভিযানে নিহত হন, তাহলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন বিপ্লবী গার্ডের কট্টরপন্থী ব্যক্তিত্বদের কেউ।

ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব এসেম্বলি অফ এক্সপার্ট (Assembly of Experts)-এর ওপর ন্যস্ত। ৮৮ সদস্যের এই ধর্মীয় পরিষদ জরুরি বৈঠকের মাধ্যমে পরবর্তী নেতা নির্ধারণ করে থাকে। ফলে দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এখন এই পরিষদের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে।

বহু বছর ধরে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনায় ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম রাইসি (Ebrahim Raisi)। বিচার বিভাগীয় প্রধান এবং পরে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে—এমন ধারণা রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু সেই সমীকরণ আমূল বদলে দেয়।

রাইসির মৃত্যুর পর আলোচনায় আসে সর্বোচ্চ নেতার পুত্র মুজতবা খোমেনী (Mojtaba Khamenei)-এর নাম। তাঁকে তুলনামূলকভাবে আড়ালে থাকা হলেও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়। বিভিন্ন বিশ্লেষকের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি নেপথ্যে সাংগঠনিক ও আর্থিক কাঠামোয় ভূমিকা রেখে আসছেন। তবে ইরানে বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ ইসলামি প্রজাতন্ত্র নিজেকে রাজতন্ত্র থেকে আলাদা রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে তুলে ধরে।

এদিকে গত জুনের ১২ দিনের সংঘাতের সময় সর্বোচ্চ নেতা সম্ভাব্য তিনজন প্রার্থীকে চিহ্নিত করেছিলেন—এমন তথ্য বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট নাম আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি, ধারণা করা হচ্ছে তাঁরা উচ্চপদস্থ আলেম বা রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব হতে পারেন।

বিশ্লেষকদের মতে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে শুধু ধর্মীয় যোগ্যতার ওপর নয়; বরং রাজনৈতিক ভারসাম্য, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সমর্থন এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অভ্যন্তরীণ ঐকমত্যের ওপরও। বিশেষ করে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত উত্তরসূরি প্রশ্নটি জল্পনা-কল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে এই পরিবর্তন ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে শুরু করে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা ও বিশ্লেষণ ইতোমধ্যে জোরালো হয়ে উঠেছে।

ইরান জানিয়েছে প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন ইসলামিক আইনজীবী তিন সদস্যের একটি অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করে সাময়িকভাবে দেশের সব শীর্ষ নেতৃত্বের দায়িত্ব পরিচালনা করবে। এটি ইরানের সংবিধানের ধারা ১১১ অনুযায়ী দফায়-দফায় করা হয়ে থাকে। যেখানে সুপ্রিম লিডার মারা গেলে বা ক্ষমতা খোয়ালে এই পরিষদ নতুন নেতা মনোনয়নের সময় পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করবে। এই তিন সদস্যের পরিষদে সাধারণত থাকেন প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন জুরি, যাকে এক্সপেডিয়েন্সি ডিসসার্নমেন্ট কাউন্সিল নির্বাচিত করে। এই পরিষদ ওই পর্যন্ত সকল শীর্ষ নেতৃত্বের দায়িত্ব সাময়িকভাবে পালন করবে যতক্ষণ না উপযুক্ত নতুন সুপ্রিম লিডার নির্বাচিত হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *