জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার পদটি সংসদীয় বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী (Bangladesh Jamaat-e-Islami)-কে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে সরকার। তবে জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়নের আগে এ পদ গ্রহণ করা হবে কি না—তা নিয়ে দলটির ভেতরে মতভেদ রয়েছে। অন্যদিকে পদটি ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (National Citizen Party–NCP)। দলটি তাদের সদস্য সচিব আখতার হোসেনকে ডেপুটি স্পিকার হিসেবে দেখতে চায়।
গণভোটের ফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার হলে আইনসভার স্পিকারের পাশাপাশি দুটি ডেপুটি স্পিকারের পদ সৃজনের প্রস্তাব রয়েছে, যার একটি বিরোধী দল পাবে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও বলা হয়েছে, আইনসভার উভয়কক্ষে দুই ডেপুটি স্পিকারের একজন সরকারদলীয় সদস্য ব্যতীত অন্যদের মধ্য থেকে মনোনীত হবেন।
নীতিগত সম্মতি, তবে শর্তসাপেক্ষ
প্রধানমন্ত্রীসহ বিএনপির শীর্ষ নেতারা গণভোটের ফল বাস্তবায়নের আগেই বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী একটি ডেপুটি স্পিকার পদ বিরোধী দলকে দিতে আগ্রহী। গত শনিবার জামায়াতের ইফতার মাহফিল-পরবর্তী চা চক্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানকে প্রস্তাব দেন, ডেপুটি স্পিকার পদে একজন মনোনয়ন দিতে। জবাবে জামায়াত আমির বলেন, গণভোটের ফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের নিশ্চয়তা পেলে তারা এ পদ নিতে আগ্রহী।
ওই বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান, রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উপস্থিত ছিলেন। জামায়াতের পক্ষ থেকে ছিলেন এটিএম আজহারুল ইসলাম, ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদসহ অন্যরা। বৈঠকে গণভোট ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
জামায়াত নেতারা বৈঠকে স্পষ্ট করেন, তাদের অগ্রাধিকার ডেপুটি স্পিকার পদ নয়; বরং গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়টিও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সরকারি দলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের পদ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং স্পিকার নির্বাচনের দিনই বিষয়টি সম্পন্ন হতে পারে।
আলোচনায় যাদের নাম
জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর প্রস্তাবে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের বিধান রাখা হয়েছে, যাতে সংসদ পরিচালনায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। বর্তমানে বিদ্যমান সংবিধানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার সাধারণত সরকারি দল থেকেই নির্বাচিত হন। জুলাই সনদে এ প্রথা বদলের কথা বলা হয়েছে।
জামায়াত সূত্রে জানা যায়, ডেপুটি স্পিকার পদে চারজন সংসদ সদস্যের নাম আলোচনায় রয়েছে—পাবনা-১ আসনের নাজিবুর রহমান মোমেন, ঢাকা-১৪ আসনের ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম, কুড়িগ্রাম-৩ আসনের ব্যারিস্টার মাহবুব সালেহী এবং পিরোজপুর-1 আসনের মাসুদ সাঈদী। এদের মধ্যে নাজিবুর রহমান মোমেনের নাম এগিয়ে।
অন্যদিকে এনসিপি থেকেও মৌখিকভাবে আখতার হোসেনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। দলটির এক নেতা জানান, জোটের পক্ষ থেকে পদটি এনসিপিকে দেওয়ার বিষয়ে জামায়াতকে জানানো হয়েছে। আলোচনা সাপেক্ষে বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে বলে তারা আশা করছেন।
জামায়াত কী ভাবছে
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিএনপি এ বিষয়ে অফার করেছে, তবে জুলাই সনদের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। দলীয় ফোরামে এখনো চূড়ান্ত আলোচনা হয়নি।
দলটির একাধিক নেতার মতে, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আগে ডেপুটি স্পিকার পদ গ্রহণ করলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ, পিআর পদ্ধতিতে ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ, সনদ অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য সংস্কারপ্রক্রিয়া থমকে যেতে পারে। কারও কারও আশঙ্কা, এ পদ গ্রহণ করলে সরকারি দল গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দায় এড়াতে পারে।
তাদের মতে, আগামী দিনের বিরোধী জোটের রাজনীতি জুলাই সনদকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে—এ বাস্তবতায় ডেপুটি স্পিকার পদ গ্রহণের সিদ্ধান্ত কেবল একটি সাংবিধানিক নিয়োগ নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ।


