স্টেথোস্কোপ থেকে রাজনীতির শীর্ষে: জামায়াতের রূপান্তরের মুখ ডা. শফিকুর রহমান

দেশের বর্তমান প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আলোচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (Bangladesh Jamaat-e-Islami)–এর অনুসারীদের কাছে ডা. শফিকুর রহমান কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বরং একজন আদর্শিক পথপ্রদর্শক। অনেকের চোখে তিনি দলটির সাম্প্রতিক রূপান্তরের প্রধান কারিগর। দীর্ঘদিন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকা জামায়াত যে এখন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে, তার পেছনে তার নেতৃত্বকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সমর্থকেরা।

তবে সমালোচকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, ডা. শফিকুর রহমান (Dr. Shafiqur Rahman)–এর নেতৃত্বে দলটি তার ঐতিহ্যগত ইসলামি আদর্শ থেকে অনেকটাই সরে এসে বাস্তব রাজনীতির সঙ্গে আপোষ করেছে। তবুও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তার উপস্থিতি এবং প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। চিকিৎসা পেশা থেকে রাজনীতির কঠিন অঙ্গনে এসে কীভাবে তিনি নিজের অবস্থান তৈরি করলেন—সেই গল্পই আজ আলোচনায়।

ডা. শফিকুর রহমানের জন্ম ১৯৫৮ সালের ৩১ অক্টোবর মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নে। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে সিলেট অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। ১৯৭৪ সালে তিনি বরমচাল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ১৯৭৬ সালে সিলেট এম.সি. কলেজ (Sylhet MC College) থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে চিকিৎসা শিক্ষায় মনোনিবেশ করে ১৯৮৩ সালে এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ (MAG Osmani Medical College) থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।

রাজনীতিতে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল একেবারেই ভিন্ন ধারায়। ১৯৭৩ সালে নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি জাসদ ছাত্রলীগে যোগ দেন এবং বামপন্থী ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। তবে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর তার রাজনৈতিক চিন্তায় বড় পরিবর্তন আসে। ১৯৭৭ সালে ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি জাসদ ছাত্রলীগ ছেড়ে ছাত্রশিবিরে যোগ দেন। পরবর্তীতে সিলেট মেডিকেল কলেজ শাখা এবং সিলেট মহানগর শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করে সংগঠনের ভেতরে নিজের নেতৃত্বের দক্ষতার পরিচয় দেন।

মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হয়েও ১৯৮৪ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন, যে দলটিকে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। দলটিতে যোগ দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ধাপে ধাপে সিলেট শহর, জেলা এবং মহানগর আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৮ সালে তিনি কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য হন এবং ২০১০ সালে তাকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এরপর দলের ইতিহাসে এক সংকটময় সময় আসে। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি হলে সাংগঠনিক নেতৃত্বে বড় শূন্যতা তৈরি হয়। সেই প্রেক্ষাপটে ২০১৬ সালে ডা. শফিকুর রহমানকে কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিন বছর পর, ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে দলের কাউন্সিলে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে তিনি জামায়াতে ইসলামীর আমীর নির্বাচিত হন। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে তিন মেয়াদে দলের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করছেন।

তার নেতৃত্বে দলটির কার্যক্রমে বেশ কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) সরকারের শাসনামলে দলটি কঠিন রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়লেও নতুন কৌশল নিয়ে সংগঠনকে সক্রিয় রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি। দলটি এবার ধর্মভিত্তিক রাজনীতির গণ্ডি কিছুটা বিস্তৃত করে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও নতুন করে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছে দলটি।

রাজনীতির বাইরেও ডা. শফিকুর রহমানকে অনেকেই মানবিক নেতা হিসেবে উল্লেখ করেন। দেশের বিভিন্ন দুর্যোগ বা সংকটময় পরিস্থিতিতে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনাগুলো তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে শক্তিশালী করেছে বলে মনে করেন সমর্থকেরা। এসব কর্মকাণ্ড দলটির জনসম্পৃক্ততা বাড়াতেও ভূমিকা রেখেছে বলে দাবি করা হয়।

পেশাগত জীবনে তিনি চিকিৎসক এবং ব্যবসায়ী। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পর এবারই প্রথম জাতীয় সংসদে প্রবেশ করেন তিনি। ঢাকা-১৫ আসনে নির্বাচন করে বিএনপি (Bangladesh Nationalist Party) সমর্থিত নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে ২১,৬১৪ ভোটে পরাজিত করে জয়ী হন।

সমালোচকরা তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সমর্থকদের প্রত্যাশা ভিন্ন। তাদের বিশ্বাস, ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দল সংসদে গঠনমূলক সমালোচনা ও রাজনৈতিক বিতর্কের মাধ্যমে দেশের মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে সক্ষম হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *