আজ শুরু ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ: পাইলটে পাচ্ছে ৩৭ হাজারের বেশি পরিবার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হচ্ছে বহুল আলোচিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। রাজধানীর বনানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে (কড়াইল বস্তি) আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির পাইলট কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)।

প্রথম ধাপে দেশের বিভিন্ন এলাকার মোট ৩৭ হাজার ৫৬৪টি পরিবার এই কার্ডের আওতায় আসবে। এসব পরিবারের নারী প্রধানদের হাতে কার্ড তুলে দেওয়া হবে এবং প্রতিটি কার্ডের বিপরীতে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা ভাতা দেওয়া হবে। পরবর্তীতে একই মূল্যের খাদ্যপণ্য সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছে সরকার।

পর্যায়ক্রমে দেশের ১৩ জেলার ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চলতি অর্থবছরে মোট ৩৮ দশমিক ০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ দশমিক ১৫ কোটি টাকা সরাসরি নগদ সহায়তা হিসেবে দেওয়া হবে এবং বাকি ১২ দশমিক ৯২ কোটি টাকা কার্ড বাস্তবায়নের অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিবারগুলোকে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে—হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত। এ বিষয়ে নারী ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন, অধিকার, মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তার মতে, প্রকল্পটি দেশের সামাজিক ন্যায় ও উন্নয়নের পথকে আরও শক্তিশালী করবে।

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির প্রস্তুতি নিয়ে সোমবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় (Ministry of Social Welfare)। সেখানে বক্তব্য দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন।

কারা পাবেন এই ফ্যামিলি কার্ড

সরকার প্রাথমিকভাবে দেশের ১৩ জেলার ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে এই কর্মসূচির পাইলট কার্যক্রম শুরু করছে। প্রথম পর্যায়ে হতদরিদ্র ও দরিদ্র পরিবারের জন্যই কার্ড দেওয়া হবে।

এই পরিবারগুলো শনাক্ত করতে সারা দেশে মোট ৬৭ হাজার ৮৫৪টি পরিবারপ্রধানের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ বা দারিদ্র্য সূচকের মাধ্যমে জনগোষ্ঠীকে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির ৫১ হাজার ৮০৫ পরিবারের তথ্য পরীক্ষা করে ৪৭ হাজার ৭৭৭টির সঠিক তথ্য পাওয়া যায়। সেখান থেকে চূড়ান্তভাবে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে ভাতার আওতায় আনা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির আলোকে প্রতিটি পরিবারে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। তিনি জানান, দলমত নির্বিশেষে প্রকৃত পরিবারই এই কার্ড পাবে। পাইলট কর্মসূচি চলবে ১০ মার্চ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত। এরপর নতুন অর্থবছরের বাজেটে এটি আরও বিস্তৃত করা হবে।

তিনি আরও বলেন, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারও কার্ড পাবে; তবে তারা তা ব্যবহার করবে না। সেই কার্ড দরিদ্র পরিবারের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে।

সংবিধানের আলোকে উদ্যোগ

ফ্যামিলি কার্ড ধারণার উৎস মূলত বাংলাদেশের সংবিধান (Constitution of Bangladesh)-এর ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদে বর্ণিত সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার। সেখানে বার্ধক্য, পঙ্গুত্ব, অকাল বৈধব্য বা অনুরূপ পরিস্থিতিতে অভাবগ্রস্ত নাগরিকদের সরকারি সহায়তার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

এই সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। বিএনপির ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার ও নীতিপত্রে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছিল, যেখানে পরিবারকে উন্নয়নের মূল একক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সেই ধারণা থেকেই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ উদ্যোগের জন্ম।

নারীর হাতে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ

এই কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—কার্ডটি ইস্যু করা হবে পরিবারের মা অথবা জ্যেষ্ঠ নারী সদস্যের নামে। এর উদ্দেশ্য পরিবারের সম্পদের ওপর নারীর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা।

নীতিনির্ধারকদের মতে, নারীর হাতে অর্থনৈতিক সহায়তা পৌঁছালে তা পরিবারের কল্যাণে সর্বোত্তমভাবে ব্যবহৃত হয়।

দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের ‘উন্নয়ন সিঁড়ি’

ফ্যামিলি কার্ড শুধু নগদ সহায়তা দেওয়ার একটি মাধ্যম নয়। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি দরিদ্র পরিবারগুলোকে দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষুদ্রঋণ এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এসব পরিবার দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে আসতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।

স্কোরের ভিত্তিতে নির্বাচন

ফ্যামিলি কার্ডের জন্য যোগ্যতা নির্ধারণ করা হচ্ছে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট (পিএমটি)’ স্কোরের মাধ্যমে। শূন্য থেকে ৭৭৭ স্কোরধারী পরিবার অতিদরিদ্র, ৭৭৮ থেকে ৭৯৬ দরিদ্র, ৭৯৭ থেকে ৮১৪ ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত, ৮১৫ থেকে ৮৩৭ নিম্নমধ্যবিত্ত এবং ৮৩৮ থেকে ১০০০ স্কোরধারী পরিবার সচ্ছল হিসেবে বিবেচিত হবে।

প্রথম পর্যায়ে কেবল প্রথম দুটি ধাপের পরিবারই কার্ড পাবে। প্রতিবছর ডিএসআর পদ্ধতির মাধ্যমে এই স্কোর হালনাগাদ করা হবে।

ভবিষ্যতে সোশ্যাল আইডি কার্ড

ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা-২০২৬ (খসড়া) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এই কার্ডকে পর্যায়ক্রমে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সোশ্যাল আইডি কার্ড’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। উন্নত দেশের সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর ব্যবস্থার মতো এটি নাগরিকের সামাজিক সুরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় সেবার সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

এটি নাগরিক অধিকার ও সামাজিক সুবিধার একটি ডিজিটাল ভান্ডার হিসেবেও কাজ করবে এবং সরকারি সেবা গ্রহণের একক প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

কার্ডের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, স্পর্শবিহীন চিপ সংবলিত আধুনিক ফ্যামিলি কার্ডে বারকোড তথ্য ও নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে কার্ডটি নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য হবে।

উপকারভোগীদের চূড়ান্ত করতে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হবে। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থা যাচাই করবেন এবং তথ্য যাচাইয়ের পর চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা হবে।

যেসব পরিবার ভাতা পাবে না

পাইলট পর্যায়ে কোনো পরিবারের সদস্য যদি সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে বেতন বা পেনশন পান, অথবা নারী পরিবারপ্রধান এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা কর্মচারী হন, তাহলে সেই পরিবার ভাতা পাওয়ার যোগ্য হবে না।

এ ছাড়া বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক লাইসেন্স, বিলাসবহুল সম্পদ যেমন গাড়ি বা এসি, কিংবা পাঁচ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থাকলেও পরিবারটি ভাতা পাওয়ার তালিকায় থাকবে না।

ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় দেওয়া ভাতা জি-টু-পি (Government to Person) পদ্ধতিতে সরাসরি সুবিধাভোগী নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *