ইরানের আকাশপথের হামলা কমেছে ৯২%: কৌশল বদলে বেড়েছে লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে ইরানের আকাশপথের হামলার মাত্রা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে বলে সামরিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ। ২৮ ফেব্রুয়ারির বিশাল আকারের প্রথম হামলার পর থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপের সংখ্যা প্রায় ৯২ শতাংশ কমে গেছে। তবে হামলার পরিমাণ কমলেও আঘাতের ঝুঁকি কমেনি; বরং এখন লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণে কৌশল বদলেছে তেহরান।

হামলার ধরনে বড় পরিবর্তন

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান যে ব্যাপক আকারের ‘শক অ্যান্ড অ’ ধরনের আক্রমণ শুরু করেছিল, তা মূলত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ছিল। কিন্তু মার্চের শুরু থেকেই সেই কৌশল বদলে ছোট ছোট লক্ষ্যভিত্তিক হামলায় চলে যায় ইরান।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ আক্রমণের দিনে গড়ে ৭০০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৫০০টির বেশি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল।

১ থেকে ৪ মার্চের মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ১৫০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২৫০টি ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়, যার বড় অংশ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি লক্ষ্য করে। বিশেষ করে কাতার (Qatar) ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (United Arab Emirates)-এ থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো তখন প্রধান লক্ষ্য ছিল।

৫ থেকে ৮ মার্চের মধ্যে আক্রমণের মাত্রা আরও কমে যায়। প্রতিদিন গড়ে ৮০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৮০টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়, যেখানে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেশি গুরুত্ব পায় বাহরাইন (Bahrain)-এর জ্বালানি অবকাঠামো।

৯ থেকে ১০ মার্চের মধ্যে এই সংখ্যা নেমে আসে আরও নিচে—প্রতিদিন গড়ে ৪৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রায় ৭০টি ড্রোন। এই সময় আক্রমণগুলো ছিল অনিয়মিত এবং অনেকটাই ‘হ্যারাসমেন্ট ওয়েভ’ বা চাপ ধরে রাখার কৌশল।

লক্ষ্যবস্তুতে নতুন অগ্রাধিকার

আক্রমণের সংখ্যা কমলেও সব দেশে সমানভাবে কমেনি। বরং কোথাও কোথাও হামলার মাত্রা বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর মাঝামাঝি সময় থেকে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। পুরো সংঘাতকালীন সময়ে দেশটি এখন পর্যন্ত ২৫৩টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১,৪৪০টি ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে।

অন্যদিকে ইসরায়েল (Israel)-এর ওপর হামলার সংখ্যা কমে গেছে। প্রথম দিনে যেখানে প্রায় ২০টি বড় আক্রমণ তরঙ্গ ছিল, মার্চের মাঝামাঝি এসে তা কমে প্রতিদিন ৪ থেকে ৬টি আক্রমণে নেমে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন উচ্চ-নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ করে নির্দিষ্ট অবকাঠামো—যেমন হাইফার তেল শোধনাগার—লক্ষ্য করছে।

কুয়েত (Kuwait) ও কাতারে হামলাও দ্রুত কমে গেছে। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে প্রায় ৭৮২টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছিল। কিন্তু এখন সেখানে প্রতিদিন কেবল কয়েকটি ড্রোন প্রতিহত করার ঘটনা ঘটছে।

কেন দ্রুত কমছে হামলার সংখ্যা

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হামলার সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে তিনটি বড় কারণ রয়েছে।

প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘লেফট-অফ-লঞ্চ’ কৌশল। এই অভিযানে ইরানের ভেতরে মোবাইল লঞ্চার ও ক্ষেপণাস্ত্র গুদাম ধ্বংস করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, সরবরাহের সীমাবদ্ধতা। ২৮ ফেব্রুয়ারির বিশাল হামলায় ১,২০০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার হওয়ায় ইরানের প্রস্তুত অস্ত্রভান্ডারের বড় অংশ শেষ হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তৃতীয়ত, যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যা। ইরানে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট হওয়ায় সংযোগ মাত্র ৪ শতাংশে নেমে আসে। এতে একসঙ্গে বহু দিক থেকে ড্রোন ঝাঁক পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি

১০ মার্চ পর্যন্ত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ইরান আর আগের মতো শতাধিক ড্রোনের বড় ঝাঁক নিয়ে আক্রমণে যাচ্ছে না। এর পরিবর্তে ছোট আকারের ‘স্নাইপার স্ট্রাইক’ কৌশল নেওয়া হয়েছে।

গত দুই দিনে তাদের আক্রমণের ধারা লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তারা ৫ থেকে ১০টি ড্রোন বা ২ থেকে ৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে আক্রমণ চালাচ্ছে, যা নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করছে। যেমন বাহরাইনের বাপকো রিফাইনারি বা ইসরায়েলের হাইফা অঞ্চলের অবকাঠামো।

বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশলের মূল লক্ষ্য সামরিক ধ্বংসের চেয়ে মানসিক চাপ ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা ধরে রাখা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *