যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আওতায় সস্তায় মাংস, পোলট্রি ও অন্যান্য প্রাণিজ পণ্য আমদানির সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার (Farida Akhter)। তবে সরকারের ভেতরে থেকেও শেষ পর্যন্ত এই চুক্তি ঠেকাতে পারেননি বলে স্বীকার করেছেন তিনি।
শনিবার রাজধানীর পান্থপথে ঢাকা স্ট্রিম কার্যালয়ে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট : ক্যাবের ১৩ দফা ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
চুক্তির গোপনীয়তা নীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে এই চুক্তি হয়নি; বরং এর প্রক্রিয়া অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। একটি দেশের সঙ্গে আরেকটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হলেও সেটি গোপন রাখার শর্তে সবাইকে সম্মত থাকতে হয়েছে।
ফরিদা আখতার বলেন, এমনকি সরকারের ভেতরেও সবাই সব তথ্য জানতে পারেনি। “এটা তো হতে পারে না,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, একটি রাষ্ট্রীয় চুক্তি নিয়ে এত গোপনীয়তা থাকা উচিত নয়।
তিনি জানান, দেশীয় খামারিদের সুরক্ষা এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে এই চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় (Ministry of Commerce) মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাংস, পোলট্রির বাচ্চা, ক্যাটফিশ ও নাড়িভুঁড়ি আমদানির বিষয়ে অনুমোদন চায়।
কিন্তু এসব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে দেশে জনস্বাস্থ্য ও প্রাণিস্বাস্থ্যের ঝুঁকি, বিশেষ করে জুনোটিক রোগের সম্ভাবনা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে আপত্তি জানানো হয়েছিল বলে জানান তিনি।
ফরিদা আখতার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে উন্নতমানের পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে প্রবেশের আগে নিজস্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকা দরকার ছিল। কিন্তু চুক্তিতে সেই সুযোগ রাখা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত উৎপাদিত মাংস বাংলাদেশে ডাম্পিং হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, এসব মাংস মূলত অতিরিক্ত উৎপাদনের ফল, যেগুলো অন্য কোথাও ফেলা সম্ভব না হওয়ায় বাংলাদেশকে ডাম্পিং গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
তিনি দাবি করেন, এসব পশুকে জেনেটিক্যালি মডিফাইড সয়াবিন ও কর্ন খাওয়ানো হয় এবং অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে এসব পণ্য বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। এতে দেশের প্রায় দুই কোটি খামারি ও পশুপালননির্ভর মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
ফরিদা আখতার বলেন, দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ গরু-ছাগল পালন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। যদি বিদেশি মাংস কম দামে বাজারে আসে, তাহলে দেশীয় খামারিরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন।
তিনি আরও বলেন, নাগরিক হিসেবে এবং সরকারের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। “শেষ দিন পর্যন্ত লড়েছি। কিন্তু সরকারের ভেতরে থেকেও চুক্তি ঠেকাতে পারিনি। এই না পারার দায় আমারও রয়েছে,” বলেন তিনি।
সাবেক এই উপদেষ্টা আরও বলেন, অনেকেই বলছেন মুহাম্মদ ইউনূস (Muhammad Yunus)-এর নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় পুরোটা হতাশাজনক ছিল। তবে বিষয়টি এত সরল নয়।
তার মতে, ১৮ মাসের একটি সরকারের সামনে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রতিদিন আন্দোলন, বিভিন্ন দাবি-দাওয়া এবং প্রশাসনিক অস্থিরতার মধ্যেই সরকারকে কাজ করতে হয়েছে। গত ১৫ বছরের জমে থাকা নানা দাবিও সেই সময় মেটানোর চাপ ছিল।
ফলে অনেক কাজ শুরু করা গেলেও সবকিছু বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তাই পুরো সময়টিকে শুধু হতাশার সময় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


