দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় থাকার প্রেক্ষাপটে এবার নতুন বিতর্কে জড়ালো ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগ। অভিযোগ উঠেছে, দলটির নিজস্ব কার্যালয়ের জন্য কেনা দোকানঘর গোপনে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত প্রায় ১৮–২০ মাস ধরে জেলায় আওয়ামী লীগের কোনো দৃশ্যমান সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই। ঝটিকা মিছিল বা কর্মসূচিও চোখে পড়েনি। এরই মধ্যে সামনে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—দলের অফিস হিসেবেই কেনা তিনটি দোকানঘর বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, শহরের মৌলভীপাড়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের মার্কেটে ২০১৮ সালে তিনটি দোকানঘর ক্রয় করা হয় দলীয় কার্যালয় গড়ার উদ্দেশ্যে। সে সময় জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকারের সঙ্গে দোকান বরাদ্দের চুক্তি হয়। প্রতিটি দোকানের মূল্য ছিল ১১ লাখ ৮৩ হাজার ৩৫০ টাকা।
কিন্তু সম্প্রতি অভিযোগ উঠেছে, কয়েক মাস আগে ৬৫ লাখ টাকায় এই তিনটি দোকান বিক্রি করা হয়েছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, শহরের এক ব্যবসায়ীর মধ্যস্থতায় এই লেনদেন সম্পন্ন হয় এবং দলের শীর্ষ নেতাদের হাতে টাকা তুলে দেওয়া হয়। যদিও এখনো দোকানের দখল হস্তান্তর সম্পন্ন হয়নি।
এদিকে, স্টার টেইলার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক সালাম চৌধুরী দাবি করেছেন, তিনি পাঁচ বছর আগেই প্রয়াত আল মামুন সরকারের কাছ থেকে দোকানগুলো কিনেছেন এবং তার কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে। তবে অনুসন্ধানে এই দাবির সঙ্গে সাম্প্রতিক বিক্রির তথ্যের অসঙ্গতি দেখা গেছে।
নেতাদের অস্বীকার, প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
দলীয় দায়িত্বশীল নেতারা সরাসরি বিক্রির বিষয়টি স্বীকার করেননি। জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম খোকন বলেন, “দোকান বিক্রির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তবে চূড়ান্ত কিছু হয়নি।” অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, এ বিষয়ে একটি রেজুলেশন করা হয়েছে।
তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক লিমিটেড (Brahmanbaria Central Cooperative Bank Limited)-এর নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম বলেন, মালিকানা পরিবর্তনের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যথাযথ অনুমোদন ও স্বাক্ষর ছাড়া এই ধরনের হস্তান্তর বৈধ নয়।
ভেতরে ক্ষোভ, বাইরে নীরবতা
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার পতনের পর জেলার আওয়ামী লীগের প্রায় সব পর্যায়ের নেতারা আত্মগোপনে চলে যান। অনেকেই একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। এ সময় বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার ও হয়রানির মুখে পড়েন বহু নেতাকর্মী।
একজন নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দলের নেতারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন, কিন্তু গ্রে’\প্তার হওয়া নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে পারেননি। এমনকি কোনো বিবৃতি বা সংগঠিত উদ্যোগও দেখা যায়নি।
মামলা ও চাপে সাংগঠনিক ভাঙন
জেলা পুলিশের তথ্যমতে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঘিরে জেলায় অন্তত ১৯টি মামলায় ১৩৬২ জনকে আসামি করা হয়েছে এবং অজ্ঞাত আসামির সংখ্যা ২৩ হাজারের বেশি। অন্যদিকে দলীয় দাবি অনুযায়ী, মামলার সংখ্যা আরও বেশি এবং বিভিন্ন উপজেলায় মিলিয়ে ৪৬টি মামলায় প্রায় ৪৮৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে—যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী।
সব মিলিয়ে, সাংগঠনিক স্থবিরতা, মামলার চাপ এবং এখন অফিস বিক্রির অভিযোগ—এই তিনের সম্মিলিত প্রভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আওয়ামী লীগের অবস্থান নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।


