এলডিসি উত্তরণ ঘিরে বাংলাদেশের প্রস্তুতিতে ঘাটতি—জাতিসংঘের সতর্ক বার্তা

চলতি বছরের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের পথে বাংলাদেশের প্রস্তুতি এখনো যথেষ্ট শক্ত অবস্থানে নেই—এমন সতর্কতা দিয়েছে জাতিসংঘ (United Nations)। রোববার (৫ এপ্রিল) প্রকাশিত একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এই চিত্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ, ভূবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ ও উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধির কার্যালয়, অর্থাৎ ইউএন-ওএইচআরএলএলএস (UN-OHRLLS)। ‘গ্র্যাজুয়েশন রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক এই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণের সব শর্ত পূরণ করলেও সামনে এখনও উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি বিদ্যমান।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে—আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশেষ সুবিধা হারানোর সম্ভাবনা, সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ বৃদ্ধি, রাজস্ব সংগ্রহ ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। এই বিষয়গুলো উত্তরণের পরবর্তী বাস্তবতায় দেশের অর্থনীতিকে নাজুক করে তুলতে পারে বলেও ইঙ্গিত করা হয়েছে।

এছাড়া, মসৃণ ও টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে প্রতিবেদনে জোর দেওয়া হয়েছে সংস্কার কার্যক্রম জোরদার, বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত নীতিগত পরিসর নিশ্চিত করা এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার ওপর।

এনসিপি (NCP) এবং ইউএন-ওএইচআরএলএলএস-এর পরামর্শ অনুযায়ী, তিনটি নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করায় আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক উত্তরণের সময় নির্ধারিত রয়েছে। তবে বাস্তবতা নিয়ে উদ্বেগও কম নয়। বিশেষ করে গত বছর ব্যবসায়ী মহলের আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে—রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক দুর্বলতার বিষয় বিবেচনায়—একটি স্বাধীন মূল্যায়নের অনুরোধ জানানো হয়েছিল।

এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান বিএনপি (BNP) নেতৃত্বাধীন সরকার গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (CDP)-এর কাছে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে ২০২৯ সালের নভেম্বরে নেওয়ার জন্য আবেদন করে। এ আবেদন ইতোমধ্যে মূল্যায়নের প্রক্রিয়ায় নিয়েছে সিডিপি।

এই মূল্যায়ন প্রণয়নের সময় ইউএন-ওএইচআরএলএলএস সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ, উন্নয়ন সহযোগী এবং জাতিসংঘ ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশের সঙ্গে বিস্তৃত পরামর্শ করেছে। ফলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বহুমাত্রিক বাস্তবতা ও সম্ভাব্য প্রভাবের একটি সামগ্রিক চিত্র।

প্রতিবেদনটিতে শুধু উত্তরণের প্রস্তুতি নয়, বরং এলডিসি-নির্দিষ্ট সহায়তা প্রত্যাহারের পরিণতিও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়ন অর্জন ধরে রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ—সেই বিষয়টিকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘের পরামর্শক মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক এবং ড্যানিয়েল গে আয়োজিত জাতীয় বহু-অংশীজন পরামর্শ সভায় এই প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী নেতা, শিক্ষাবিদ এবং সরকারি উপদেষ্টারা—যা পুরো বিষয়টিকে জাতীয় গুরুত্বের আলোচনায় নিয়ে আসে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *