জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া বিলটি ঘিরে বিরোধী জোটের ভেতরে ভিন্ন অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পেয়েছে সমর্থনের সুর—বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (National Citizen Party – NCP)-এর সুস্পষ্ট অবস্থান জামায়াতে ইসলামী বিরোধীতাকে অনেকটাই ম্লান করে দেয়। । জামায়াতের আপত্তি আর এনসিপি’র সমর্থনের মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রেখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিতে বিল পাস হয় জাতীয় সংসদে । এ নিয়ে সংসদে বিতর্ক, আপত্তি এবং বক্তব্য—সবই হয়েছে, তবে শেষ পর্যন্ত কণ্ঠভোটেই পাস হয় বিলটি।
বৃহস্পতিবার সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান (Ahmed Azam Khan)। আলোচনার সময় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামী (Bangladesh Jamaat-e-Islami)-এর আমির শফিকুর রহমান (Shafiqur Rahman) বিলটির বিভিন্ন দিক নিয়ে আপত্তি তোলেন। তিনি সংজ্ঞা ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ধরেন এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমালোচনা করেন।
তবে এই আপত্তির বিপরীতে একই জোটের শরিক এনসিপি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়—তাদের পক্ষ থেকে বিলটির ওপর কোনো আপত্তি নেই। সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (Hafiz Uddin Ahmed) এ তথ্য তুলে ধরেন, যা কার্যত বিলটির প্রতি রাজনৈতিক সমর্থনকে আরও জোরালো করে তোলে।
এই অবস্থান সংসদের ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও সংজ্ঞা নির্ধারণে রাষ্ট্রীয় অবস্থানকে সমর্থন করার প্রশ্নে এনসিপি স্পষ্ট ও নির্দ্বিধা। অন্যদিকে জামায়াতের আপত্তি থাকলেও তা জোটের অভ্যন্তরে সমর্থন পায়নি, বরং একক অবস্থান হিসেবেই থেকে যায়।
এর আগে সংসদের বিশেষ কমিটিতে জামায়াতের পক্ষ থেকে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া হয়েছিল। সেখানে তারা দাবি করে, অধ্যাদেশে অন্তর্ভুক্ত কিছু সংজ্ঞা ও রাজনৈতিক দলগুলোর উল্লেখ পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে সেই আপত্তি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেনি।
অধ্যাদেশে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের স্বীকৃতির বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংসদীয় প্রক্রিয়ায় বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বক্তব্য থাকলেও আলাদা কোনো ভোটাভুটি হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে এনসিপির সমর্থন বিল পাসের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
সব মিলিয়ে, জামুকা বিল পাসের ঘটনায় একদিকে যেমন মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা ও ইতিহাস পুনঃনিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ সামনে এসেছে, তেমনি জোট রাজনীতির ভেতরের ভিন্নমতও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে—যেখানে সমর্থনের ভারসাম্য শেষ পর্যন্ত বিল পাসের পথ সুগম করেছে।


