বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বাভাস: মূল্যস্ফীতি ছাড়াতে পারে ১২%

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank)। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়নের যৌথ প্রভাবে চলতি বছরের ডিসেম্বর নাগাদ দেশের মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে গেলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে। এই দুই ধাক্কা মিলেই মূল্যস্ফীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যদি চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে জ্বালানি তেলের দাম ৭০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে আরও ৩০ শতাংশ বাড়ে, তাহলে সরকারকে দেশীয় বাজারে তেলের দাম সমন্বয় করতে হতে পারে। পাশাপাশি একই সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রথম প্রান্তিকে ৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে আরও ৫ শতাংশ কমে গেলে ডিসেম্বর নাগাদ মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

আরও একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে বলা হয়েছে, যদি দ্বিতীয় প্রান্তিকে টাকার অবমূল্যায়ন ১০ শতাংশে পৌঁছে এবং তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, তাহলে মূল্যস্ফীতি ১২ দশমিক ২৮ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে। এতে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ আরও তীব্র হবে।

এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও বড় ধাক্কার আশঙ্কা করা হয়েছে। বর্তমান ভিত্তি অনুযায়ী রিজার্ভ ৩১ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২৪ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসতে পারে। অন্য এক হিসাব অনুযায়ী, এটি ২ হাজার ৬০৬ কোটি ডলার পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (Bangladesh Bureau of Statistics – BBS)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৪৩ কোটি ডলার।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি স্থিতিশীল থাকে এবং দেশে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমে আসতে পারে এবং তা ১০ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।

তবে বিপরীত পরিস্থিতিতে—যদি তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যায় এবং ডলারের ওপর চাপ বাড়ে—তাহলে টাকার মান আরও কমবে, আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে। তখন মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে হতে পারে, যা রিজার্ভ কমিয়ে দেবে।

এমন প্রেক্ষাপটে, অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষায় সরকারকে রাজস্ব আহরণ, ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি মূল্যের মধ্যে সমন্বয় করতে হতে পারে। একই সঙ্গে বিনিময় হার কিছুটা নমনীয় করা বা ডলারের দাম বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্তও প্রয়োজন হতে পারে।

সব মিলিয়ে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়ন—এই দুই প্রধান উপাদান দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যমূল্যের ওপর তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যা শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *