অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভিভিআইপি প্রটোকলের মেয়াদ কমানো হয়েছে—এমন দাবিতে যে আলোচনা তৈরি হয়েছিল, সেটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে স্পষ্ট বিভ্রান্তি। বাস্তবে তার এই বিশেষ মর্যাদার মেয়াদ শেষ হয়নি; বরং নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তিনি পূর্ণ এক বছরই এই সুবিধা ভোগ করবেন।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ড. ইউনূসকে দেওয়া ‘ভেরি ভেরি ইমপরট্যান্ট পারসন’ বা ভিভিআইপি মর্যাদা ছয় মাস কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই হিসাব অনুযায়ী, আগামী ১০ আগস্টের পর তিনি আর এই মর্যাদা বা সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সুবিধা পাবেন না—এমন তথ্যও ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণে এসব দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি।
এই বিভ্রান্তির অবসান ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় স্পষ্ট করেছে, ড. ইউনূসের ভিভিআইপি প্রটোকল পূর্বঘোষিত সময় অনুযায়ীই বহাল রয়েছে। সরকার সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের সূত্র ও প্রজ্ঞাপনের বিশ্লেষণ থেকে জানা গেছে, তার পদমর্যাদার মেয়াদে কোনো কাটছাঁট হয়নি। বরং তিনি নির্ধারিত এক বছর পর্যন্ত বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী বা এসএসএফ-এর পূর্ণ সুরক্ষা পাবেন।
সম্প্রতি কয়েকটি গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছিল, বর্তমান সরকার তার এই মর্যাদা ছয় মাস কমিয়ে দিয়েছে এবং আগামী ১০ আগস্টের পর থেকে তার জন্য এসএসএফ নিরাপত্তা থাকবে না। তবে দায়িত্বশীল সূত্র ও সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন বলছে, এ ধরনের তথ্য সঠিক নয় এবং বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল নেই।
ঘটনার পেছনের প্রজ্ঞাপনটি খতিয়ে দেখা হলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। গত ২৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার স্বাক্ষরিত একটি নতুন প্রজ্ঞাপন (এস.আর.ও. নং ৮০-আইন/২০২৬) জারি করা হয়। এতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১০ ফেব্রুয়ারি জারি করা পূর্বের আদেশ (এস.আর.ও. নং ৪৬-আইন/২০২৬) ‘অক্ষুণ্ণ রাখা’ হয়েছে।
এই ১০ ফেব্রুয়ারির আদেশেই ড. মুহাম্মদ ইউনূস (Muhammad Yunus)-কে তার দায়িত্ব হস্তান্তরের পরবর্তী এক বছরের জন্য ভিভিআইপি মর্যাদা এবং বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল। ফলে নতুন প্রজ্ঞাপন কোনোভাবেই সেই সুবিধা কমায়নি।
২৩ এপ্রিলের প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী আইন, ২০২১-এর আওতায় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টাকে তাদের দায়িত্ব হস্তান্তর বা পদত্যাগের পরবর্তী ছয় মাসের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করা হবে। তবে এই বিধানটি ভবিষ্যতের জন্য প্রযোজ্য—বর্তমান ক্ষেত্রে নয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, নতুন প্রজ্ঞাপনে উল্লেখিত ছয় মাসের সময়সীমা ভবিষ্যতে দায়িত্ব গ্রহণকারী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। ড. ইউনূসের ক্ষেত্রে পূর্বঘোষিত এক বছরের সুবিধাই বহাল থাকবে।
আইনগত বিশ্লেষণেও একই চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of Bangladesh)-এর একজন সিনিয়র আইনজীবী জানিয়েছেন, যেহেতু নতুন প্রজ্ঞাপনে পূর্বের আদেশ অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, তাই ড. ইউনূসের ভিভিআইপি সুবিধা নিয়ে কোনো আইনি জটিলতা নেই। বরং এটি ভবিষ্যৎ সরকারপ্রধানদের নিরাপত্তা কাঠামোতে একটি স্থায়ী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
এদিকে, যেসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে আগামী ১০ আগস্টের পর তার নিরাপত্তা তুলে নেওয়া হবে, তা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি নির্ধারিত ভিভিআইপি প্রটোকল এবং এসএসএফ সুরক্ষা পেয়ে যাবেন—যা তার জন্য আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল।


