নারী শিক্ষায় নতুন দিগন্ত: স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

দেশে নারী শিক্ষার প্রসারে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)। তিনি জানিয়েছেন, সরকার এখন স্নাতক (ডিগ্রি) পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের জন্য শিক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—যা দেশের শিক্ষা খাতে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপনী বক্তৃতায় এই ঘোষণা দেন তিনি। বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বরং তিনি এমন একটি আধুনিক, মানসম্মত ও শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে চান, যেখানে শিক্ষার্থীরা কেবল পরীক্ষানির্ভর না হয়ে দক্ষতা ও মানবিকতায়ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আগামী জুলাই মাস থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে স্কুলব্যাগ, পোশাক ও জুতা সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার ভাষায়, শিক্ষার্থীদের একটি সম্মানজনক ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করাই সরকারের অগ্রাধিকার।

নারী শিক্ষার প্রসঙ্গে ফিরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP) সরকারের সময় দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতাকেই আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে এবার স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত এই সুবিধা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, মেধাভিত্তিক উপবৃত্তির ব্যবস্থাও রাখা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা আরও উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারীদের অবমূল্যায়ন করে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোই আজকের অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি করেছে। “আমরা যখন ক্ষমতায় ছিলাম, তখন দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা ফ্রি করেছিলাম। এবার আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, নারীদের স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষা ফ্রি করা হবে,”—এভাবে নিজের বক্তব্যে তিনি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দিকটি পরিষ্কার করেন।

নারী ক্ষমতায়নের প্রশ্নে তিনি আরও জানান, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্প ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের পথে। এই প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তার জবাবে তিনি বলেন, এটিকে ব্যয় হিসেবে না দেখে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ এই অর্থ সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখবে।

শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গে তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, আগামী জুলাই থেকে ধাপে ধাপে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হবে। “আমি চাই শিক্ষার্থীরা সুন্দর ও মানসম্মত পরিবেশে পড়াশোনা করুক”—এই বক্তব্যে তার পরিকল্পনার মানবিক দিকটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়েও কথা বলেন তারেক রহমান। তিনি দাবি করেন, এই সংসদ একটি ফ্যাসিবাদমুক্ত পরিবেশে পরিচালিত হয়েছে এবং দেশের স্বার্থকে সামনে রেখেই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার মতে, এই সংসদ মূলত জনগণের কল্যাণের জন্যই কাজ করছে।

তিনি আরও স্মরণ করেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা এবং ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের। তাদের প্রত্যাশা ছিল স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থান—যা পূরণ করাকে তিনি সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন।

জ্বালানি সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও বিরোধী দলের প্রস্তাব গ্রহণের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, একটি যৌথ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এটি একটি জবাবদিহিমূলক সরকার, যা জনগণের দুর্ভোগ কমাতে যেকোনো গঠনমূলক প্রস্তাব গ্রহণে প্রস্তুত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *