তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাধীন গণমাধ্যম অপরিহার্য, আর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নই বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি। তিনি স্পষ্ট করে জানান, অতীতে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের যে সংস্কৃতি বিরাজমান ছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে সরকার এখন তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
শনিবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাব (National Press Club)-এ ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘গণমাধ্যমের নতুন চ্যালেঞ্জ অপতথ্য: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (Bangladesh Federal Union of Journalists) এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (Dhaka Union of Journalists)।
মন্ত্রী তার বক্তব্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ৫ আগস্টের পর রাষ্ট্রকে নতুনভাবে পুনর্গঠনের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিতর্কিত একটি সংসদ বাতিল হয়ে যাওয়ার পর জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নতুন সরকার গঠন করেছে, যার ফলে দেশে গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া পুনরায় সক্রিয় হয়েছে। তার মতে, এই পরিবর্তিত বাস্তবতা বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসকে ঘিরে নতুন করে ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণমাধ্যমকে ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং একটি সভ্য সমাজে এর স্বাধীনতা অপরিহার্য। তবে তিনি সতর্ক করে দেন, এখন আর তথ্যপ্রাপ্তির অভাব বড় সমস্যা নয়; বরং তথ্য বিকৃত করে বিভ্রান্তি তৈরি করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সত্যকে আড়াল করে ভিন্ন রূপে উপস্থাপনের এই প্রবণতার বিরুদ্ধে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিয়ে তিনি বলেন, স্বাধীনতা মানে দায়িত্বহীনতা নয়। ‘ক্লিন ইনফরমেশন’ বা পরিচ্ছন্ন তথ্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, যেমন অক্সিজেন ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না, তেমনি তথ্য ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না। কিন্তু সেই তথ্য যদি দূষিত হয়, তবে তা সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম। আরও বক্তব্য রাখেন বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী এবং সাংবাদিক নেতা ও যুগান্তর (Jugantor) সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার।
কাদের গনি চৌধুরী তার বক্তব্যে বলেন, অপতথ্য বা মিসইনফরমেশন এখন কেবল ডিজিটাল সমস্যায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুক (Facebook) ও ইউটিউব (YouTube)-এ ‘তথ্য সন্ত্রাস’ চলছে, যা মানুষের সম্মান ও অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলছে।
তথ্য বিশৃঙ্খলা বা ‘ইনফরমেশন ডিসঅর্ডার’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সামাজিক মাধ্যমের নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় একাডেমিক গবেষণা ও পেশাদার সাংবাদিকতার সমন্বয় অপরিহার্য বলে মত দেন তিনি।
অন্যদিকে, কবি আবদুল হাই শিকদার তার বক্তব্যে ‘দৈনিক বাংলা’, ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ ও ‘টাইমস’-এর মতো ঐতিহ্যবাহী পত্রিকাগুলো পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, একসময় এসব প্রতিষ্ঠান দেশের সেরা সাংবাদিকদের কেন্দ্র ছিল, কিন্তু বর্তমানে সেগুলো ধ্বংসপ্রায়। এগুলো পুনরায় চালু করা গেলে সাংবাদিকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং সংবাদপত্র জগতে গুণগত পরিবর্তন আসবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আবদাল আহমদ। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক নেতা এলাহী নেওয়াজ খান সাজু, ড. আবদুল হাই সিদ্দিক, মোহাম্মদ আবদুল বাছিরসহ আরও অনেকে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম।
সেমিনারে বক্তারা স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা জোরদারের দাবি জানান।


