বিএনপির নীতিনির্ধারণী পরিসরে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় (Gayeshwar Chandra Roy) অবশেষে তার রাজনৈতিক জীবনের ছয় দশক পেরিয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৩ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে তিনি পেয়েছেন ৯৮ হাজার ৭৮৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী (Bangladesh Jamaat-e-Islami) মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অধ্যক্ষ শাহিনুর ইসলাম পান ৮২ হাজার ২৩২ ভোট।
এর আগে ২০০৮ সালের নবম এবং ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party) প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও জয়ের মুখ দেখেননি তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পর এবারের ফলাফল তার জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
১৯৫১ সালে কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নের মির্জাপুর রায় পরিবারে জন্ম নেওয়া এই প্রবীণ রাজনীতিক ছাত্রজীবনেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে, ১৯৬৬ সালে, প্রগতিশীল ধারার রাজনীতির মাধ্যমে তার পথচলা শুরু। সত্তরের দশকে তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (Jatiya Samajtantrik Dal – JSD)-এর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে জাতীয়তাবাদী যুবদল (Jatiyatabadi Jubo Dal)-এ যোগদানের মাধ্যমে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮৭ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত টানা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সংগঠনের ভিত শক্ত করতে ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার গ্রেপ্তারও হয়েছেন তিনি।
১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে তিনি টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় (বর্তমান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়) এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক—দুই ক্ষেত্রেই সেই সময় তার সক্রিয় উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে অন্যতম প্রভাবশালী হিন্দু নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার পারিবারিক সম্পর্কও রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তার ছেলে অমিতাভ রায়ের সঙ্গে বিএনপি নেতা নিতাই রায় চৌধুরী (Nitai Roy Chowdhury)-এর মেয়ে নিপুণ রায় চৌধুরীর বিয়ে হয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মাগুরা-২ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নিতাই রায় চৌধুরী ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮৯৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।
এক আলাপচারিতায় গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জানান, তার ৬০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে কখনোই তিনি দলের কাছে নিজে থেকে মনোনয়ন চাননি। ২০০৮ ও ২০১৮ সালে দলের সিদ্ধান্তেই তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। তবে তার দাবি, সে সময়কার ভোট পরিস্থিতির কারণে তিনি বিজয়ী হতে পারেননি। তার ভাষায়, রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার লিপ্সা তাকে কখনো স্পর্শ করেনি; বরং তিনি সবসময় নিজেকে একজন ভালো রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন।
ছয় দশকের সেই দীর্ঘ পথচলার পর অবশেষে সংসদে প্রবেশ—গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের জন্য এটি শুধু একটি নির্বাচনী জয় নয়, বরং এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের পরিণতি।


