রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় যাত্রীবাহী একটি বাস পদ্মা নদীর পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর গভীর রাত পর্যন্ত চলে উদ্ধার অভিযান। সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি ৩ নম্বর পন্টুনে ওঠার সময় হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদী (Padma River)-তে পড়ে যায়। দুর্ঘটনার পরপরই এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক, আর ঘাটজুড়ে শুরু হয় স্বজনদের হৃদয়বিদারক আহাজারি।
বুধবার (২৫ মার্চ) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা তলিয়ে যাওয়া বাসটিকে পানির নিচ থেকে তুলে আনে। বাসের ভেতর থেকে তখন একে একে উদ্ধার করা হয় ১৫ জনের মরদেহ। এর আগে, বাসটি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার মুহূর্তেই স্থানীয়রা আরও দুজনের মরদেহ উদ্ধার করেন। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ১৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিস (Rajbari Fire Service)-এর উপসহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা জানান, উদ্ধারকৃত মরদেহগুলো গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, “উদ্ধার অভিযান এখনো চলমান রয়েছে, নিখোঁজদের খোঁজে ডুবুরি দল নিরলসভাবে কাজ করছে।”
পরিচয় মিলছে, বাড়ছে শোকের ভার
এই দুর্ঘটনায় ইতোমধ্যে কয়েকজন যাত্রীর পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। কুমারখালী থেকে বাসে ওঠা যাত্রীদের মধ্যে রয়েছেন গিয়াস উদ্দিন রিপন (৪৫), তার স্ত্রী লিটা খাতুন (৩৭) এবং তাদের সন্তান আবুল কাসেম সাফি (১৭) ও আয়েশা বিন্তে গিয়াস (১৩)। গিয়াস উদ্দিন খোকসা উপজেলার শোমসপুর গ্রামের বাসিন্দা। ঈদের ছুটি কাটিয়ে তারা ঢাকায় তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাকওয়া ফুড প্রোডাক্টে ফিরছিলেন।
খোকসা থেকে বাসে ওঠা দেলোয়ার (৩০), তার স্ত্রী এবং তিন বছরের ছেলে ইসরাফিল এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, যা স্বজনদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এছাড়া ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার খোন্দকবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. নুরুজ্জামান (৩২) তার পরিবারসহ বাসটিতে ছিলেন। ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নুরুজ্জামানের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তার স্ত্রী আয়েশা আক্তার (৩০) ও সাত মাস বয়সী সন্তান আরশান এখনো নিখোঁজ। তাদের চার বছর বয়সী সন্তান নওয়ারা আক্তারও বাসে ছিল। একইসঙ্গে গিয়াস উদ্দিনের কন্যা আয়েশার কোনো খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি।
ঘাটজুড়ে শোক আর অপেক্ষা
জানা গেছে, বাসটিতে প্রায় ৪৫ জন যাত্রী ছিলেন। ফেরিতে ওঠার সময় হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেটি নদীতে পড়ে যায়। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার সার্ভিস (Fire Service)-এর ডুবুরি দল এবং অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলা পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌ পুলিশ এবং প্রশাসনের বিভিন্ন ইউনিট একযোগে কাজ করছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত রয়েছেন জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
এদিকে ফেরিঘাট এলাকায় নিখোঁজদের স্বজনদের কান্না আর অপেক্ষা যেন থামছেই না। প্রতিটি উদ্ধার অভিযানের খবরের দিকে তাকিয়ে আছেন তারা—হয়তো ফিরে আসবে প্রিয়জন, কিংবা মিলবে অন্তত শেষ দেখা।


