যুক্তরাষ্ট্র সফররত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান ওয়াশিংটন ডিসিতে স্টেট ডিপার্টমেন্ট (State Department)–এর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আলোচনায় উঠে এসেছে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, রোহিঙ্গা সংকট, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রসঙ্গ।
৯ জানুয়ারি শুক্রবার ওয়াশিংটনে ড. খলিলুর রহমান বৈঠক করেন আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট ফর পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স মিস অ্যালিসন হুকার এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট মি. পল কাপুরের সঙ্গে। বৈঠকে বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক রূপান্তর
আন্ডার সেক্রেটারি হুকারের সঙ্গে বৈঠকে ড. রহমান জানান, নির্বাচন ঘিরে প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা কীভাবে হচ্ছে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
জবাবে হুকার বলেন, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় সমর্থন অব্যাহত রয়েছে এবং তারা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যাশা করে ফেব্রুয়ারিতে।
ভিসা বন্ড ও ব্যবসা-বাণিজ্য
ড. রহমান যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে ভিসা বন্ড সহজ করার অনুরোধ জানান। তিনি প্রস্তাব করেন, স্বল্পমেয়াদি ব্যবসায়িক ভিসা (B-1) থেকে বাংলাদেশিদের বন্ড অব্যাহতি দেওয়া হোক।
হুকার জানান, যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে। তিনি বলেন, যদি ভবিষ্যতে বাংলাদেশি পর্যটকদের ‘ওভারস্টে’ কমে, তাহলে বন্ড সংক্রান্ত শর্ত শিথিল করা হতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকট ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
ড. রহমান যুক্তরাষ্ট্রকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বড় দাতা।
জবাবে হুকার বাংলাদেশকে প্রশংসা করে বলেন, “রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আপনারা বিশ্ব দরবারে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।” তিনি বোঝা ভাগাভাগির প্রয়োজনীয়তা ও টেকসই সমাধানের ওপর জোর দেন। রোহিঙ্গাদের জীবিকাভিত্তিক সুযোগ বাড়ানোরও অনুরোধ জানান।
ডিএফসি ও সেমিকন্ডাক্টর খাত
নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. রহমান বাংলাদেশি বেসরকারি খাতের জন্য ডিএফসি (DFC) অর্থায়নে প্রবেশাধিকার এবং বাংলাদেশে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বিনিয়োগে সহযোগিতা চেয়েছেন। হুকার জানিয়েছেন, এসব বিষয় যুক্তরাষ্ট্র বিবেচনায় নেবে।
গাজা পরিস্থিতি ও শান্তিরক্ষা বাহিনী
ড. রহমান নীতিগতভাবে গাজায় সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেন। হুকার বলেন, এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে প্রস্তুত।
অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি কাপুরের সঙ্গে বৈঠক
একই দিনে পৃথক বৈঠকে অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট পল কাপুরের সঙ্গে ড. রহমান বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন, রোহিঙ্গা সংকট, ভিসা বন্ড, বিনিয়োগসহ নানা পারস্পরিক আগ্রহের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিতি
বিশেষ আমন্ত্রণে ড. রহমান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরে বাংলাদেশে নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন (Brent Christensen)-এর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। শপথ বাক্য পাঠ করান ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিসোর্সেস মাইকেল জে. রিগাস।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, বাংলাদেশ দূতাবাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা, স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা, সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূতরা ও ব্যবসায়ী নেতারা।
বক্তব্যে ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট বলেন, “বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।” রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, “উজ্জ্বল গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পথে বাংলাদেশের যাত্রায় আমরা পাশে আছি। নির্বাচনের ফলাফলের দিকে আমরা আগ্রহভরে তাকিয়ে আছি এবং নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে একযোগে কাজ করে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে চাই।”
ড. খলিলুর রহমানের সফরের সব কর্মসূচিতে তাঁর সঙ্গে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের দূতাবাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা।


