বাংলাদেশে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) আবারও তাদের আগ্রহ ও পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। তবে এবার ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের অর্থ হিসেবে নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস।
শনিবার দুপুরে ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, নির্বাচন যেন হয় স্বচ্ছ, শান্তিপূর্ণ এবং বাস্তব অর্থেই অংশগ্রহণমূলক, সেটিই ইইউ’র প্রত্যাশা। তবে এবার অংশগ্রহণমূলক বলতে রাজনৈতিক দলগুলোর উপস্থিতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ভোটারের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও উপস্থিতিকে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ইভার্স ইজাবস বলেন, “আমাদের কাছে অংশগ্রহণমূলক মানে সব সামাজিক গোষ্ঠী— নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং আঞ্চলিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি। একই সঙ্গে ভোটারদের বিশ্বাসযোগ্যভাবে ভোট দেওয়ার হারকেও আমরা মূল্যায়নের অংশ হিসেবে দেখি।”
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, অতীতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক বলতে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণকেই মূল মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করত। এবার সেই ধারণা থেকে কিছুটা সরে এসে ভোটারের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তির পরিসরকে গুরুত্ব দিচ্ছে ইইউ।
রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ইজাবস বলেন, “আমরা জানি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলের নিবন্ধন, বিরোধ মীমাংসা ও রূপান্তরকালীন বিচার সংক্রান্ত বিষয়গুলো দীর্ঘদিনের জটিলতা। তবে এসব নিয়ে আমরা কোনো মন্তব্য করবো না। বরং নির্বাচন, ভোটার উপস্থিতির মতো বিষয়গুলোতে এসব ইস্যুর প্রভাব আমরা মূল্যায়ন করবো।”
আইনশৃঙ্খলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে সতর্ক পর্যবেক্ষণ
বর্তমান পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের উপযোগী কি না—এমন প্রশ্নে ইভার্স ইজাবস বলেন, “বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। একদিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতা রক্ষা—এই ভারসাম্য কতটা রক্ষা করা হচ্ছে, সেটিই আমাদের মনোযোগের কেন্দ্রে থাকবে।”
সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসাথে হওয়া নিয়ে মন্তব্য
একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন নিয়ে উদ্বেগ আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “একই দিনে দুটো ভোট সচরাচর দেখা যায় না, তবে কিছু দেশে এমন হয়েছে। আমরা মূলত সংসদ নির্বাচনই পর্যবেক্ষণ করবো, কারণ গণভোট আমাদের ম্যান্ডেটের বাইরে। তবে যেহেতু উভয় প্রক্রিয়া পরস্পর সংযুক্ত, তাই নাগরিকরা তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কি না—সেদিকে আমাদের নজর থাকবে।”
২০০ সদস্যের বিশাল ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশন
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন ইতোমধ্যেই আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছে। বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে গঠিত এই মিশনে থাকছেন:
– ১১ জন বিশ্লেষক বিশিষ্ট একটি কোর টিম
– ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক
– ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক
– ইইউ সদস্য রাষ্ট্র ও অংশীদার দেশ (কানাডা, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড) থেকে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক
– ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি প্রতিনিধিদল
এই মিশন পরিচালিত হবে তিনটি মূলনীতির ভিত্তিতে: স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও হস্তক্ষেপহীনতা।
কী কী পর্যবেক্ষণ করবে ইইউ মিশন?
ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন (EU EOM) পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার:
– প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক কাঠামো
– প্রচারণা কার্যক্রম
– আইনগত কাঠামো ও বাস্তবায়ন
– নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তি
– ভোটগ্রহণ ও গণনা
– গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা
বিশেষভাবে তারা নারী, তরুণ এবং ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও নাগরিক অংশগ্রহণের মাত্রা বিশ্লেষণ করবে। এছাড়া ভোটারদের সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণে মিডিয়ার ভূমিকা নিয়েও থাকবে আলাদা ইউনিট।
শেষ পর্যন্ত, মিশনটি মূল্যায়ন করবে নির্বাচন কতটা জাতীয় আইন ও আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক নির্বাচন মানদণ্ড অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়েছে।


