“যদি মেরে ফেলেন তাহলে আব্বার সঙ্গে দেখা হবে, আর যদি ছেড়ে দেন তাহলে আম্মার সঙ্গে”—এই কথাগুলো বলেছেন হুম্মাম কাদের চৌধুরী (Hummam Quader Chowdhury)। গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি তার নিজ অভিজ্ঞতার বর্ণনায় বলেন, তাকে কীভাবে ২০১৬ সালে গুম করে ‘আয়না ঘর’ নামে পরিচিত জেআইসি’–তে আটকে রেখে মাসের পর মাস নির্যাতন করা হয়েছিল।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন প্যানেলে হুম্মামের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। এটি এই মামলায় প্রথম দিনের প্রথম সাক্ষ্য।
‘বেঁচে আছি, কিন্তু কিভাবে জানি না’
তিনি বলেন, বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত থাকার কারণেই ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট তাকে গুম করা হয়। প্রথম দুই মাস দেয়ালের একটি পেরেকে দাগ দিয়ে দিন গুনতেন। সময় বোঝার উপায় ছিল খাবার—রুটি এলে বুঝতেন সকাল, ভাত-মাছ এলে দুপুর বা রাত। তার শরীরে বারবার ইনজেকশন দেওয়া হতো, যা দিত ভয়ংকর যন্ত্রণার অনুভব। একপর্যায়ে তার পায়ে বড় ফোঁড়া হয়, হাঁটতে পারতেন না। অপারেশন হয় সেলেই—চৌকির সঙ্গে বেঁধে, অজ্ঞান অবস্থায়। পরে তার কোডনেম জানতে পারেন: “ভিআইপি-১”।
তিনি বলেন, তার সেলে সবসময় আলো জ্বলে থাকত, যা মানসিক নির্যাতনের অংশ ছিল। ইন্টারোগেশন কক্ষে চোখের বাঁধন একবার সরে গেলে দেখতে পান সাউন্ডপ্রুফ দেয়ালঘেরা একটি ছোট কক্ষ, যেখানে তাকে নির্যাতন করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে বাবার (সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী) রাজনীতি, আওয়ামী লীগের বিরোধিতা, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগসহ নানা প্রশ্ন করা হতো। পাশে থাকা অন্য বন্দির কোরআন তেলাওয়াত, কান্না ও ঢেকুর তোলার শব্দ শুনতেন তিনি। পরে জানতে পারেন তিনি ছিলেন ব্রিগেডিয়ার আমান আযমী।
মুক্তির আগমুহূর্তে বলা হয়, ‘প্রধানমন্ত্রী সেকেন্ড চান্স দিতে চান’
হুম্মাম বলেন, তাকে একদিন জিজ্ঞাসা করা হয়, তাকে ছেড়ে দিলে বাইরে কী বলবেন? জবাবে তিনি বলেন, “আপনারা যা বলবেন তাই বলব।” তখন তাকে বলা হয়: “কিছু দুষ্ট লোক আপনাকে কিডন্যাপ করেছিল, আপনি তাদের কাছ থেকে পালিয়ে এসেছেন।” এখানেই তিনি প্রথমবারের মতো বুঝতে পারেন, এই গোটা ঘ’টনার পেছনে শেখ হাসিনা’র হাত রয়েছে।
তিনি বলেন, তার মুক্তির তিন দিন আগে রাতে তাকে তিন স্তরের চোখ বাঁধা অবস্থায় হ্যান্ডকাফ পরিয়ে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। একপর্যায়ে গাড়ি থামে, চোখ খুলে দেখা যায় তিনি ধানমন্ডি ৭/এ এলাকায়। হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরলেও দারোয়ান তাকে চিনতে পারেনি। তার পোষা কুকুর তাকে চিনে গেট খুলে দেয়। বাসায় ঢুকে জানতে পারেন, মা এখন গুলশানে ভাইয়ের বাসায়। সেখানেই যান।
‘আমি বিচার চাই, যেন আর কাউকে এভাবে গুম না হতে হয়’
পরবর্তীতে হুম্মাম জানতে পারেন, তাকে আটকের সময় সিটিআইবির পরিচালক ছিলেন ব্রিগেডিয়ার তৌহিদুল ইসলাম, ডিজিএফআই প্রধান ছিলেন জেনারেল আকবর এবং মুক্তির সময় প্রধান ছিলেন জেনারেল আবেদিন। তিনি বলেন, “যারা আমাকে গুম করেছে, আয়না ঘরে আটকে রেখে নির্যাতন করেছে, তাদের বিচার চাই। শেখ হাসিনা, জেনারেল আকবর, আবেদিন, ব্রিগেডিয়ার তৌহিদুলসহ যারা হুকুমদাতা ও সহযোগী ছিল, সবার সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।”
জবানবন্দি শেষে হুম্মামের জেরা হয়নি। আসামিপক্ষের আবেদনে বিচারপতির প্যানেল আগামী ২৫ জানুয়ারি জেরা গ্রহণের দিন ধার্য করেছে।


