শুক্রবার দুপুর ১টা ৫৩ মিনিট। জুমার নামাজ শেষ হতেই আচমকা কেঁপে ওঠে ঢাকা, তার সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং ভারতের কলকাতাও। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, এটি ছিল ৫.৪ মাত্রার একটি মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প। স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ১টা ৫২ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে কম্পনটি অনুভূত হয় বলে জানানো হয়েছে।
আবহাওয়া বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ১৮৮ কিলোমিটার দূরে খুলনার সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলায়। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইউএসজিএস (United States Geological Survey) এটির মাত্রা ৫.৩ বলে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় মাটির প্রায় ৯.৮ কিলোমিটার গভীরে এই কম্পন সৃষ্টি হয়।
তাৎক্ষণিকভাবে আইফোনের অ্যালার্ট সিস্টেমে রিখটার স্কেলে ৫.৪ মাত্রার এবং অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসে ৪.৯ মাত্রার তথ্য ভেসে ওঠে, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা আলোচনা শুরু হয়।
কলকাতা থেকে গণমাধ্যমকর্মী অমিতাভ ভট্টশালী জানিয়েছেন, সেখানেও শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়েছে। অনেকেই আতঙ্কে বহুতল ভবন ছেড়ে রাস্তায় বা খোলা জায়গায় আশ্রয় নেন। সীমান্তের দুই পাশেই মুহূর্তের জন্য ছড়িয়ে পড়ে উদ্বেগ।
উৎপত্তিস্থল আশাশুনি উপজেলার নির্বাহী অফিসার মো. সাইদুজ্জামান হিমু জানান, আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নে দুটি মসজিদ ও একটি ব্যক্তিগত বাড়িতে ফাটল দেখা গেছে। এছাড়া দুটি কাঁচা ঘর হেলে পড়েছে। তবে এর বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
মাত্র একদিন আগেই, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরেকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। আবহাওয়া বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সেটির মাত্রা ছিল ৫.১ এবং উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৪৬২ কিলোমিটার দূরে।
গত নভেম্বরে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা কেঁপে ওঠে। সে সময় অন্তত ১০ জন নি’\হত ও কয়েকশ মানুষ আহত হওয়ার খবর জানায় সরকার। বিভিন্ন জেলায় বহু ভবনে ফাটলের তথ্যও পাওয়া গিয়েছিল। ওই ঘটনার পর একই সপ্তাহে আরও কয়েক দফা কম্পন অনুভূত হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
সবশেষ ভূমিকম্প নিয়ে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, ৯.৮ কিলোমিটার গভীরতাকে খুব বেশি গভীর বলা যায় না। সাতক্ষীরার এই স্থানের অবস্থান পূর্বপরিচিত ফল্টলাইনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Dhaka) ভূ-তত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, “নতুন করেও ফল্ট তৈরি হতে পারে।” তাঁর তথ্য অনুযায়ী, ১০ থেকে ১৫ বছর আগেও এই অঞ্চলে পাঁচ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, ভূগর্ভে ইন্ডিয়ান প্লেট ও বার্মিজ প্লেটের অবস্থান পরিবর্তন বহুদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। “ভারতীয় প্লেট পূর্বদিকে বার্মা প্লেটের নিচে সাবডাক্টেড হয়ে যাচ্ছে। সেখানে একটি টান বা টেনশন তৈরি হচ্ছে। সেই টেনশন থেকেই এই ভূমিকম্পের সৃষ্টি,” বলেন তিনি।
তবে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের আশঙ্কা এখানে তুলনামূলক কম বলেও মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। কারণ এটি তিনটি বড় সাবডাকশন জোনের সংযোগস্থল থেকে বেশ দূরে অবস্থিত।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “একটা রাবারকে যদি দুই দিক থেকে টানতে থাকেন, একসময় মাঝখানে ছিঁড়ে যাবে। এখানেও ঘটনাটা তেমনই। ইন্ডিয়ান প্লেটের পশ্চিমাংশকে বিশাল ভূখণ্ড ধরে রাখছে, আর পূর্ব প্রান্ত বার্মা প্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে। এই টানাপোড়েনেই টেনশনাল ফোর্স তৈরি হচ্ছে।”
তাঁর মতে, এই অঞ্চলে ৫ থেকে ৫.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে, যা খুব বেশি উদ্বেগজনক নয়। বরং ডাউকি ফল্ট এবং সিলেট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত পাহাড়ি সাবডাকশন জোনই বেশি চিন্তার। “ওখানেই প্রচুর শক্তি জমা হয়ে আছে,” বলেন তিনি।
এর আগেও তিনি সতর্ক করে জানিয়েছেন, ওই অঞ্চলে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূকম্পন সৃষ্টির মতো শক্তি সঞ্চিত রয়েছে, যা কোনো না কোনো সময় মুক্তি পেতেই পারে। তবে আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত হাতে এলে পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও বিস্তারিতভাবে বলা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।


