কর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে নিজেই অবস্থান ধর্মঘটে বসে পড়েছিলেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য। ঘটনাটি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। তিনি আর কেউ নন—দেশের সর্বকনিষ্ঠ সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ (Abdul Hannan Masud)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৬ (Noakhali-6) হাতিয়া আসন থেকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে এখন জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এই তরুণ।
মাত্র ২৬ বছর বয়সে আইনপ্রণেতা হওয়া মাসউদ এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Dhaka)-এর স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। জাতীয় রাজনীতিতে তার পথচলা দীর্ঘদিনের নয়, কিন্তু অল্প সময়েই তিনি জয় করেছেন হাতিয়ার লাখো মানুষের আস্থা। রাজনৈতিক কোনো পারিবারিক ভিত্তি ছাড়াই প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আর সাহসী পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানে তার দৃঢ় ভূমিকা তাকে দেশব্যাপী পরিচিতি এনে দেয়। আন্দোলনের প্রথম সারির নেতারা যখন ডিবি হেফাজতে, তখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া গণআন্দোলনের হাল ধরেছিলেন হান্নান। ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার বিপরীতে। সেই সময়ের অস্থিরতায়, শত প্রাণহানীর শোকের ভেতরেও তার নেতৃত্ব ছিল দৃশ্যমান ও উচ্চকিত। আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তরুণ প্রজন্মের কাছে হয়ে ওঠেন সাহসের প্রতীক।
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বুড়িরচর ইউনিয়নে ২০০০ সালে জন্ম নেওয়া মাসউদের বেড়ে ওঠা এক সাধারণ পরিবারে। তার বাবা আবদুল মালেক স্থানীয় এক মাদ্রাসা শিক্ষক। মাদ্রাসা থেকে দাখিল ও আলিম পাস করে ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পরবর্তীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। আন্দোলন তীব্র হলে এবং প্রথম সারির সমন্বয়করা আটক হলে তিনিই সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) সরকারের পতনের পরও থেমে থাকেননি হান্নান। নিজ এলাকা হাতিয়ায় ফিরে শুরু করেন দস্যুবিরোধী আন্দোলন। তার নেতৃত্বে চলা প্রতিবাদের মুখে নোয়াখালী-৬ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলীকে আটক করে প্রশাসন। এরপর চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেন এবং হাতিয়ার সব নৌরুটে ন্যায্য ভাড়া নির্ধারণে কাজ শুরু করেন। এই পদক্ষেপই প্রথম তাকে সাধারণ মানুষের আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
এর পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের দফতরে দফতরে ঘুরে ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলে বেড়িবাঁধ নির্মাণ, ভূমিহীনদের জমি বুঝিয়ে দেওয়া এবং হাতিয়ায় ফেরি চালুর মতো উদ্যোগ নেন তিনি। ফলে অল্প সময়েই পুরো উপজেলায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এই তরুণ নেতা।
গণঅভ্যুত্থানের পর প্রতিষ্ঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (National Citizen Party – NCP)-এর প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন হান্নান। বর্তমানে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নবীন এই দলের প্রতীক ‘শাপলা কলি’ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মাহবুবের রহমান শামীম (Mahbuber Rahman Shamim)-এর চেয়ে ২৬ হাজার ৭৪৬ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হন।
এলাকার মানুষের প্রত্যাশা—সংগ্রামের দিনগুলোর মতোই বিপদ-আপদে সবসময় পাশে থাকবেন তাদের এই তরুণ প্রতিনিধি। ২৬ বছর বয়সেই যিনি রাস্তায় বসে প্রতিবাদ করতে জানেন, তার কাছে হাতিয়াবাসীর চাওয়া একটাই—ক্ষমতার নয়, মানুষের রাজনীতি।


