‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ পরিচয়ে অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ ও প্রচার করলে ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষে দ্রুত বিচারের নির্দেশ

‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ পরিচয়ে মোবাইল বা ক্যামেরা ব্যবহার করে অনুমতি ছাড়াই কোনো ব্যক্তির ভিডিও ধারণ এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করলে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হবে—এমন তথ্য জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম (Fakir Mahbub Anam)।

মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এই তথ্য তুলে ধরেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৮তম দিনে নেত্রকোণা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম হিলালী (Rafiqul Islam Hilali) এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন, যা পূর্বনির্ধারিত থাকলেও ২১ এপ্রিল উপস্থাপন করা হয়।

লিখিত প্রশ্নে সংসদ সদস্য উল্লেখ করেন, অনেকেই ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ পরিচয়ে ঘুরে ঘুরে মানুষের অজান্তে ভিডিও ধারণ করছেন এবং তা আকর্ষণীয় বা রসালো শিরোনামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে এসব ভিডিওকে কেন্দ্র করে হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবির অভিযোগও উঠছে। এর প্রেক্ষিতে সরকার কী ধরনের প্রতিরোধমূলক, আইনগত ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নিয়েছে—তা জানতে চান তিনি।

জবাবে মন্ত্রী জানান, ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ অনুযায়ী ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আইনের ধারা ২৫(১) অনুযায়ী, ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন বা সেক্সটরশনের উদ্দেশ্যে কোনো তথ্য, ভিডিও বা চিত্র প্রকাশ, প্রচার বা প্রচারের হুমকি দেওয়া—এসবই অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে ধারা ২৫(২) অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। ভুক্তভোগী নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু হলে ধারা ২৫(৩) অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। এছাড়া চাঁদা দাবির বিষয়টি ধারা ২২-এর আওতায় পড়বে, যেখানে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার বিষয়ে মন্ত্রী জানান, আইনের ধারা ৮ অনুযায়ী জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মহাপরিচালক ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষমতা রাখেন এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (Bangladesh Telecommunication Regulatory Commission) তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। ধারা ৯ অনুযায়ী জাতীয় সাইবার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার এই ধরনের অপরাধ শনাক্ত ও প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।

এছাড়া ধারা ৩৫ অনুযায়ী, জরুরি পরিস্থিতিতে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি চালানো, কম্পিউটার বা সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি জব্দ করা এবং অপরাধীকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিনি জানান, আইনের ধারা ৫ ও ৬ অনুযায়ী জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি গঠন করা হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ নিয়োগ বাধ্যতামূলক। এই সংস্থা কেন্দ্রীয়ভাবে অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ ও প্রচারের অভিযোগ পর্যবেক্ষণ করবে এবং ধাপে ধাপে এর অবকাঠামো ও জনবল বাড়ানো হবে।

স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ধারা ৮(৩ ও ৪) অনুযায়ী, কোনো কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণের তিন দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের অনুমোদন নিতে হবে এবং ব্লক করা কনটেন্টের তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশের বিধান রাখা হয়েছে।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ধারা ৯ অনুযায়ী আধুনিক ক্লাউডভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে রিয়েল-টাইমে ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত করা হবে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তথ্য ও লগ আদান-প্রদানের মাধ্যমে সীমান্ত অতিক্রম করে সংঘটিত অপরাধ শনাক্তের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

তদন্ত সক্ষমতা বাড়াতে ধারা ১০ ও ১১ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করা হবে, যেখানে ভিডিওর উৎস, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় এবং ব্যবহৃত ডিভাইস দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। ধারা ৩২ অনুযায়ী, তদন্ত ৯০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার বিধান রাখা হয়েছে, যা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

এছাড়া ধারা ৪৮ অনুযায়ী, বিদেশ থেকে পরিচালিত অপরাধের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার ব্যবস্থা রয়েছে। একইসঙ্গে দেশের বাইরে অবস্থান করেও বাংলাদেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে এই ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে, সেটিও এই আইনের আওতায় বিচারযোগ্য হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *