গণপরিষদ নির্বাচনসহ চার দাবিতে মাঠে নামছে এনসিপি , আসছে দেশব্যপী কর্মসূচী

গণপরিষদ নির্বাচন ও বিচার দাবিতে রাজপথে জাতীয় নাগরিক পার্টি

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ, সংবিধান পুনর্লিখনে গণপরিষদ নির্বাচন, জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন এবং দুই হাজার ছাত্র-জনতার হত্যাকাণ্ড ও ৩১ হাজার আহত ব্যক্তির বিচারের দাবিতে মাঠে নামছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (National Citizens’ Party – NCP)।

আগামী সপ্তাহ থেকে ঢাকাসহ সারাদেশে এ চারটি দাবি নিয়ে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলবে দলটি। শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের নিয়ে এনসিপি কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে। দলটি চায় জাতীয় নির্বাচনের আগে সংবিধান পুনর্লিখনের জন্য গণপরিষদ নিশ্চিত করতে। প্রয়োজনে জাতীয় নির্বাচন ও গণপরিষদ নির্বাচন একসঙ্গে করতে চায় তারা।

এনসিপির দাবির পেছনের প্রেক্ষাপট

এনসিপি নেতারা বলছেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতা হারিয়েছে। হাজার হাজার ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে কেবল সরকার পরিবর্তনই নয়; বরং শাসনব্যবস্থা ও সাংবিধানিক কাঠামোর পরিবর্তন করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

তাদের দাবি, সত্যিকারের গণতন্ত্র, ইনসাফ ও সাম্য নিশ্চিত করতে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বাইরের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বিপ্লবীদের মতামত ও প্রধান বিচারপতির পরামর্শে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে এবং প্রধান উপদেষ্টা জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন।

গণপরিষদ: ইতিহাস ও বর্তমান বিতর্ক

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে গণপরিষদ নতুন কিছু নয়। ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ সংবিধান রচনার জন্য প্রথম এবং একমাত্র গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল, যেখানে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়ী প্রতিনিধিরা সদস্য ছিলেন।

বর্তমানে ৫ আগস্টের ঘটনার পর সংবিধান পরিবর্তনের দাবি ওঠায় গণপরিষদ নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে। কিছু রাজনৈতিক দল গণপরিষদ ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে চায়, আবার কেউ জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ও হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে চায়।

এনসিপির অবস্থান ও কর্মসূচি

আগামী সপ্তাহ থেকে এনসিপি বিশেষ চারটি দাবিতে দেশজুড়ে কর্মসূচি পালন করবে। দলটির মতে, দাবি পূরণের আগে তারা নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নেবে না।

আখতার হোসেন (Akhtar Hossain), এনসিপির সদস্য সচিব, বলেন, “আমরা গণপরিষদ ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক প্রার্থী দেব। সরকারকে সংস্কার ও বিচারের উদ্যোগ নিতে হবে, নইলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।”

এছাড়া, তিনি বলেন, “জুলাই ঘোষণাপত্র কেবল ঐতিহাসিক দলিল নয়; বরং এর আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত। সরকারকে দ্রুত এটি বাস্তবায়ন করতে হবে।”

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া

এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন (Samanta Sharmin) বলেন, “বিএনপি (Bangladesh Nationalist Party – BNP) গণপরিষদের ব্যাপারে এককভাবে আপত্তি করেনি, তবে সংসদ ও গণপরিষদ নির্বাচন একসঙ্গে হলে তাদের আপত্তি থাকতে পারে। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে।”

জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ডা. মাহমুদা মিতু (Dr. Mahmuda Mitu) বলেন, “সংবিধান পরিবর্তন ছাড়া জাতীয় নির্বাচন সম্ভব নয়। বিচার, সংস্কার, গণপরিষদ নির্বাচন আগে নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দেশে গুম-খুনের রাজনীতি আবার ফিরে আসবে।”

এবি পার্টির (AB Party) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু (Mojibur Rahman Monju) বলেন, “ছাত্ররা যখন এক দফার দাবিতে সরকার পতনের আন্দোলন করেছিল, তখন আমরা তাদের সমর্থন দিয়েছি। গণপরিষদের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যাবে না। সংবিধান পুনর্লিখন জরুরি।”

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও জাতীয় সংলাপ

নাহিদ ইসলাম (Nahid Islam), এনসিসির আহ্বায়ক, বলেন, “গণপরিষদ নির্বাচন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন একসঙ্গে হলে নতুন কাঠামো ও নতুন বাংলাদেশ গঠিত হতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “বিচারের পর সংস্কার কার্যক্রম করে দ্রুত জাতীয় সংলাপ আয়োজন করা দরকার। জুলাই সনদ ও জুলাই ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন করতে হবে।”

সারসংক্ষেপ

এনসিপি চারটি মূল দাবিতে আন্দোলন শুরু করতে যাচ্ছে:
1. আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ
2. সংবিধান পুনর্লিখনে গণপরিষদ নির্বাচন
3. জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন
4. ছাত্র-জনতার হত্যাকাণ্ডের বিচার

আগামী দিনগুলোতে এই দাবিগুলো নিয়ে দেশের রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়তে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *